শূন্য শুল্কে কাঁচামাল আমদানির জালিয়াতি চক্র

উৎপাদনে নেই, রফতানিও বন্ধ। তালাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। তারপরও থেমে নেই শূন্য শুল্কে কাঁচামাল আমদানি। মিথ্যা তথ্য দিয়ে বন্ড সুবিধায় নিয়মিত কাঁচামাল আমদানি করে চলেছেন তৈরি পোশাক খাতের কিছু ব্যবসায়ী। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৩ প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা এমন ৭০ কনটেইনার পণ্যের চালান শনাক্ত করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

এ ৭০ কনটেইনার কাঁচামাল আমদানিতে বেশকিছু জালিয়াতি শনাক্ত করেছে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। এগুলো হচ্ছে— ব্যাংকের ভুয়া প্রত্যয়নপত্রের ব্যবহার, রফতানি কার্যক্রমে সক্রিয় না থাকা, প্রকৃত আমদানিকারকের পরিচয় গোপন, পণ্য উৎপাদন-সংক্রান্ত কোনো মেশিনারিজ না থাকা এবং ফ্রি অব কস্ট (এফওসি) ভিত্তিতে আমদানির প্রাপ্যতা অতিক্রান্ত হওয়া। সুনির্দিষ্ট জালিয়াতির বিষয় উল্লেখসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে আমদানি হওয়া এসব চালানের ছাড়করণ কার্যক্রম আটকে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সংস্থাটি। যদিও এর মধ্যে বেশকিছু চালান বন্দর থেকে খালাস হয়ে গেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে।

জানা গেছে, জালিয়াতি শনাক্ত হওয়া এ ৭০ চালানের মধ্যে ৪১টিই আমদানি হয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠানের নামে। প্রতিষ্ঠান চারটি হচ্ছে— ঢাকার দক্ষিণখান ঠিকানার বিএন ফ্যাশন (বিডি) লিমিটেড, যার বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিন) ১৮০২১০৪০৩০০; নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কুতুবপুর ঠিকানার মিসওয়ার হোসিয়ারি মিলস (বিন-১৯২৬১০০৪৫১০); ঢাকার পূর্ব রামপুরা ঠিকানার আশিয়ানা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ (বিন-১৯০৪১০৬২৪৮০) ও চট্টগ্রামের ধনিয়ালাপাড়া ঠিকানার ফ্যাশন ক্রিয়েট অ্যাপারেলস লিমিটেড (বিন-২৪০৩১০২৯২২৭)।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জালিয়াতির মাধ্যমে বিএন ফ্যাশন (বিডি) লিমিটেডের আমদানি করা চালানের সংখ্যা ১৭। এসব চালানের নথিতে আমদানিকারকের লিয়েন ব্যাংক দেখানো হয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের টঙ্গী শাখাকে। কিন্তু শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্ত দল ব্যাংকটির এ শাখায় যোগাযোগ করে জানতে পারে, ১৭টি চালানের বিষয়ে ব্যাংক থেকে এফওসি প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করা হয়নি। পরে তদন্ত দল প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ের ঠিকানায় সরেজমিন পরিদর্শন করলে সেটিও তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পায়। এখন সব চালানই ছাড়করণ কার্যক্রম স্থগিত করে রাখা হয়েছে।

কাস্টমসের নথি অনুযায়ী, এর আগে বিএন ফ্যাশন চলতি বছর ১৩টি ও গত বছর ২২টি চালানে ফ্যাব্রিকস আমদানি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে।

শূন্য শুল্কে আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত থাকা আরেক প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জের মিসওয়ার হোসিয়ারি মিলস ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাঁচ লাখ কেজি পণ্য আমদানি করে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি এ দুই অর্থবছরে কোনো পণ্যই রফতানি করেনি। শুল্ক গোয়েন্দা দল প্রতিষ্ঠানটির নামে আমদানি হওয়া চালানের নথিতে উল্লেখিত লিয়েন ব্যাংক আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেডের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চ ও নারায়ণগঞ্জ শাখায় যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়, এ প্রতিষ্ঠানের আমদানি কার্যক্রমে কোনো প্রত্যয়নপত্র ইস্যু হয়নি। পরে সরেজমিন পরিদর্শন করে তদন্ত দল জানতে পারে, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে মিসওয়ার হোসিয়ারি মিলসের উৎপাদন।

তবে চট্টগ্রাম বন্দরে থাকা ১০ কনটেইনার চালানের সঙ্গে মিসওয়ার হোসিয়ারি মিলসের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিকেএমইএর পরিচালক শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, মিসওয়ার হোসিয়ারি গত বছর কিছু পণ্য আমদানি করে। সেগুলোর রফতানিও হয়ে গেছে। বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোও হয়েছে। চলতি বছর কোনো আমদানি আমরা করিনি। আমাদের যে পণ্যগুলো ২০১৭ সালে এসেছিল, তখন লাইসেন্সও সচল ছিল, কারখানাও চালু ছিল। ব্যাংক ও বন্ড সুবিধা না থাকায় এখন সাব-কন্ট্র্যাক্ট ভিত্তিতে চলছে কারখানা। এখন যদি কেউ আমাদের নাম ব্যবহার করে কোনো আমদানি করে থাকে, সেটার কোনো দায় আমি কীভাবে ও কেন নেব?

ঢাকার পূর্ব রামপুরা ঠিকানার আশিয়ানা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজের ১০ কনটেইনার পণ্যের চালানের খালাস কার্যক্রম আটকাতে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম। কারণ প্রতিষ্ঠানটির লিয়েন ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখা থেকে শুল্ক গোয়েন্দাদের জানানো হয়েছে, ২০১৫ সালের পর থেকে আশিয়ানা গার্মেন্টসের নামে কোনো আমদানি-রফতানি সম্পন্ন হয়নি। এসব পণ্য চালানের বিপরীতে এফওসি-সংক্রান্ত কোনো প্রত্যয়নপত্রও ইস্যু করা হয়নি। পরে সরেজমিন পরিদর্শন করেও প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ পায় গোয়েন্দা দল। যদিও এর আগে ২০১৫ সালে ৫৮টি, ২০১৬ সালে ৫৭টি ও গত বছর ২০১৭ সালে ১৩টি চালানের পণ্য আমদানি ও খালাস হয়েছিল এ প্রতিষ্ঠানটির নামে।

সরেজমিন আশিয়ানা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানার ঠিকানায় গিয়ে ওই নামে কোনো সচল কারখানা পাওয়া যায়নি। সেখানে গিয়ে জানা যায়, ১৪ তলা ভবনের ৩ থেকে ১২ তলা পর্যন্ত এক সময় আশিয়ানা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও গত রোজার মাসে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। ভবনের অষ্টম তলা পর্যন্ত উঠে একাধিক তলার প্রবেশমুখে আশিয়ানার নাম লেখা থাকলেও কোনো মেশিন বা শ্রমিক নেই। একটি ছোট কারখানা বর্তমানে ওই ভবনে আছে, যেখানে সাব-কন্ট্র্যাক্ট ভিত্তিতে কাজ চলছে। তবে সেই কারখানার সঙ্গে আশিয়ানা কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করা হয়েছে।

মোবাইল ফোনে আশিয়ানা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছে, এ কারখানাটি বন্ধ হয়েছে গত রোজার আগে এপ্রিল মাসে। শুল্ক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অবগত আছে।

জালিয়াতি শনাক্ত হওয়ায় চট্টগ্রামের ধনিয়ালাপাড়া ঠিকানার ফ্যাশন ক্রিয়েট অ্যাপারেলসের চারটি চালানের খালাস কার্যক্রম স্থগিত করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সাতটি আগামপত্রের (বিল অব এন্ট্রি) মাধ্যমে খালাস হওয়া কাঁচামাল প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিগত ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বরের পর প্রতিষ্ঠানটি কোনো পণ্য রফতানি করেনি। অথচ গত বছরও সাতটি চালানে পণ্য আমদানি হয়েছে ফ্যাশন ক্রিয়েট অ্যাপারেলসের নামে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির লিয়েন ব্যাংক মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের শাখা থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, ফ্যাশন ক্রিয়েট অ্যাপারেলসের নামে এফওসি-সংক্রান্ত কোনো প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করেনি তারা।

এ চারটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আশিয়ানা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও বিএন ফ্যাশন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ফ্যাশন ক্রিয়েট অ্যাপারেলস লিমিটেড সক্রিয় আছে। চট্টগ্রামের এ কারখানাটি প্রায় ২০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে চট্টগ্রাম শুল্ক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানটি কিছু পণ্য আমদানি করার পর শুল্ক কর্তৃপক্ষের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বোঝাপড়ায়ও সমস্যা হওয়ায় নেতিবাচক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। গতকাল এ-সংক্রান্ত শুনানিতে অংশ নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক। বন্ড কর্তৃপক্ষ কারখানা কর্তৃপক্ষকে রফতানির সব দলিল দেয়ার জন্য এক মাসের সময় দিয়েছে।

জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করা বাকি নয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গাজীপুরের চন্দনা ঠিকানার এসআরকেএইচ ডিজাইন লিমিটেডের (বিন-১৮০৭১০২৬১৫০) আমদানি প্রাপ্যতা অতিক্রান্ত হওয়া ছাড়াও ইউডিতে গরমিল রয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে এসআরকেএইচ ডিজাইন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হামিদুর রহমান বলেন, অভিযোগটি সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল নই। আমাদের কারখানা বন্ধ হয়নি। কোনো সন্দেহ থাকলে কারখানা দেখেও যেতে পারেন। আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ পেলে অবশ্যই এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, জালিয়াতি শনাক্ত হওয়ায় অন্য আট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গাজীপুর ঠিকানার জিয়ান গার্মেন্টস (বিন-০০০৫৪৩৮৪৯) এফওসি ভিত্তিতে যে আমদানি করেছে, তা বিগত বছরের রফতানির ৭৭৮ শতাংশ। সাভারের আশুলিয়া ঠিকানার লিলাড ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেডের (বিন-১৭১৫১০০৩৫০০) এফওসি ভিত্তিতে আমদানির প্রাপ্যতা অতিক্রান্ত হয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গী ঠিকানার ক্যাপরি গার্মেন্টস ও একই ঠিকানার ক্যাপরি অ্যাপারেলস লিমিটেডেরও এফওসি ভিত্তিতে আমদানি প্রাপ্যতা অতিক্রান্ত হয়েছে। চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী রোড ঠিকানার অ্যাপারেল অপশনসের (বিন-২৪০০১০৭৫২৭৭) তিন কনটেইনার পণ্যের চালানে উল্লেখিত ব্যাংকের এফওসি প্রত্যয়নপত্র ভুয়া এবং প্রতিষ্ঠানটি গত বছর কোনো রফতানি করেনি। ঢাকার খিলক্ষেত ঠিকানার নবাব ফ্যাশন লিমিটেডের (বিন-১৮১৪১০৪৫৮২৬) ও গাজীপুরের টঙ্গী ঠিকানার সাদ ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেডের চালানের কনটেইনারে ইউডিতে গরমিল ও মিথ্যা ঘোষণা রয়েছে। চট্টগ্রামের ডিকে অ্যাপারেলস লিমিটেড (বিন-২৪০৭১০২৭৬৯৩) ভুয়া এফওসি প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে আমদানি করেছে।

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের তদন্তে ৭০টি চালানের জালিয়াতি অনিয়ম নিশ্চিত হওয়ার পরও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বেশকিছু কনটেইনার বের হয়ে গেছে। বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) তা অবহিত করেছি। এ ব্যাপারে আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণ করছি। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এ ধরনের বেশকিছু চালান ছেড়ে দেয়ার জন্য কারা দায়ী তা নিয়েও কাজ করব। এখানে নিশ্চয়ই অশুভ কোনো চক্র কাজ করেছে। সেটা খুঁজে বের করার পর এনবিআরের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

অনিয়ম-জালিয়াতি নিশ্চিত হওয়ার পরও বন্দর থেকে চালান ছেড়ে দেয়ার অনুমতি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার ড. এ কে এম নুরুজ্জামান বলেন, শুল্ক গোয়েন্দার পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে যে পর্যবেক্ষণগুলোর কথা বলা হয়েছে তার একটি হলো, আমদানিকারকের প্রাপ্যতা নেই। পরে এফওসি সম্পর্কিত এনবিআরের দেয়া আদেশ অনুসরণ করে বেশকিছু শর্ত দিয়ে পণ্য ছাড়করণের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এনবিআরের আদেশে বলা আছে, প্রাপ্যতা থাকুক আর না থাকুক যদি রফতানি হবে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় তবে খালাস দিয়ে দিতে হবে। এছাড়া বিজিএমইএ, বন্ড কমিশনারেট থেকে প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে বলা হয়েছে। এসব শর্ত যেসব আমদানিকারকের পক্ষ থেকে পূরণ করা হয়েছে, আমরা সেগুলো বন্দর থেকে ছেড়ে দিয়েছি।

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment