নানা উদ্যোগেও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ভিওআইপি

অবৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কল কমিয়ে আনতে গত কয়েক বছরে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল (ভিওআইপি) প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবৈধ পথে আসা এ ধরনের কল কমাতে দেয়া হয়েছে নতুন ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) ও ভিওআইপি সার্ভিস প্রোভাইডার (ভিএসপি) লাইসেন্স। সেলফোন সংযোগ ব্যবহারকারীর পরিচয় শনাক্তে চালু হয়েছে বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন পদ্ধতি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানও চলছে। তার পরও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ভিওআইপি।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে, দেশে এখন প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি মিনিট কল হচ্ছে অবৈধ ভিওআইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। মিনিটপ্রতি সর্বনিম্ন পৌনে ২ সেন্ট হিসাবে এর মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। আর অবৈধ এ ভিওআইপিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সেলফোন অপারেটর টেলিটকের সিম।

অবৈধ ভিওআইপিসহ সব ধরনের অনিয়ম বন্ধে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে চালু হয় বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন কার্যক্রম। বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে গ্রাহক কোনো অপারেটরের সিম কিনতে চাইলে সেন্ট্রাল বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন মনিটরিং প্লাটফর্মের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ গ্রাহকের অন্যান্য সংযোগসংক্রান্ত তথ্য এ প্লাটফর্ম থেকে যাচাই করা হয়। এটি থেকে অনুমোদন পেলেই কেবল সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের সিম নিবন্ধন করে অপারেটর। এর মাধ্যমে ভিওআইপি বন্ধের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।

গত ৯ থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুর, আদাবর, বাড্ডা ও উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ছয়টি আবাসিক স্থাপনায় বিটিআরসি ও র্যাবের অভিযানে বিভিন্ন সেলফোন অপারেটরের ১০ হাজার ৯৪৭টি সিম জব্দ করা হয়। এর মধ্যে টেলিটকের সিম ছিল ৫ হাজার ৭৫টি। এছাড়া এয়ারটেল ও রবির সিমের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৯৭, গ্রামীণফোনের ১ হাজার ৪১৪, বাংলালিংকের ৪২৬, পিএসটিএন অপারেটর র্যাংকসটেলের ১২০ ও ওয়াইম্যাক্স অপারেটর বাংলালায়নের ১৫টি। এসব অভিযানে ৩৭ লাখ টাকার অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জামসহ আটজনকে গ্রেফতারও করা হয়।

২০১৬ সালের ২৯ জুন থেকে ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৬টি অভিযানে অবৈধ ভিওআইপিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১১৬ জনকে আটক করা হয়। এসব অভিযানে গ্রামীণফোনের ২ হাজার ৩৫৭, রবির ১ হাজার ৫৯০, বাংলালিংকের ১ হাজার ৯২২ ও এয়ারটেলের ১ হাজার ৫০০টি সিম জব্দ করা হয়। শুধু টেলিটকেরই সিম জব্দ হয় ১০ হাজার ৭৩৫টি।

বিটিআরসির পরিসংখ্যানই বলছে, এর পরও এখনো প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি মিনিট কল হচ্ছে অবৈধ ভিওআইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। সর্বনিম্ন আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন রেট ১ দশমিক ৭৫ সেন্ট হিসাবেও এর মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার ডলার। বছরের হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৯৬ লাখ ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকার বেশি। আর সরকার খাতটি থেকে রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা।

অবৈধ এ ভিওআইপি বন্ধে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক। গতকাল বিটিআরসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, অবৈধ সিমের জন্য আগেও জরিমানা করেছি, এখনো করা হবে। কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তায় অবৈধ ভিওআইপিতে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সিমবক্সের অবস্থান চিহ্নিত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে বিটিআরসি। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদান থেকে সরকারের ৫০ কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় হবে। আগামীতে অবৈধ ভিওআইপির ঘটনায় প্রচলিত মামলার সঙ্গে মানি লন্ডারিং আইনের ধারা যোগ করা হবে। এক্ষেত্রে দুদকের সহায়তা নেবে বিটিআরসি।

কমিশন বলছে, ভিওআইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবৈধ পথে আন্তর্জাতিক কল কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এটি শনাক্তে সিম বক্স ডিটেকশন সিস্টেম, সেলফ রেগুলেশন প্রসেস, সিগোস সিস্টেম ছাড়াও নতুন করে চালু হয়েছে থ্রিভিআই সিস্টেম। এছাড়া অবৈধ কল টার্মিনেশন রোধে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং কমিটি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ কমিটি কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে অভিযান।

বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন হওয়ার পরও অবৈধ ভিওআইপিতে সিম ব্যবহার প্রসঙ্গে বিটিআরসির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোস্তফা কামাল বলেন, এখানে সেলফোন অপারেটরদের ভূমিকা আছে। কারণ বায়োমেট্রিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুর পর এটা হওয়ার কথা না। অভিযান চালানোর পর প্রতিটি সিমের তথ্য বিশ্লেষণ করে তা অপারেটরদের জানানো হয়। কারণ দর্শাতে নোটিস দেয়া হয়। সন্তোষজনক উত্তর না পেলে জরিমানা করা হয়।

বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে বৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ ছিল গড়ে প্রতিদিন ৪ কোটি ৬১ লাখ মিনিট। ২০১২ সালে যা ছিল সাড়ে ৩ কোটি, ২০১৩ সালে ৪ কোটি ৬৫ লাখ ও ২০১৪ সালে ৭ কোটি মিনিট। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১২ কোটি মিনিট। এর পর থেকে ক্রমেই বৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ কমছে। এতে খাতটি থেকে সরকারের আয়ের পরিমাণও কমে আসছে। গত অর্থবছরে খাতটি থেকে আয়ের পরিমাণ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম।

মূলত প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এ কল করেন। এছাড়া ব্যবসায়িক নানা প্রয়োজনেও অনেকেই বিদেশ থেকে ফোন করেন। ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ের (আইজিডব্লিউ) মাধ্যমে আসা এসব কলের হিসাবই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দেয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে প্রতিদিন যে হারে কল আসে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কল আসে বিশেষ বিশেষ উৎসব কিংবা পার্বণের দিনগুলোতে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক কল থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৪০ শতাংশ বিটিআরসি, ২০ শতাংশ আইজিডব্লিউ, ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) ও ২২ দশমিক ৫ শতাংশ অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক সার্ভিস (এএনএস) প্রোভাইডার পেয়ে থাকে। আইজিডব্লিউর মাধ্যমে আসা এসব কল আইসিএক্স হয়ে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দেয় এএনএস প্রোভাইডার হিসেবে পরিচিত সেলফোন ও ফিক্সড ফোন অপারেটররা।

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment