মাদক মামলায় ‘ফাঁসিয়ে’ টাকা আদায়ের অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস ॥ রাজধানীর পল্লবীতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক বৃদ্ধের পরিবারের সদস্যদের মাদক মামলায় ‘ফাঁসিয়ে’ টাকা আদায় এবং বসতবাড়ি বিক্রির জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

ওই পরিবারের সদস্যদের ধারণা, পৌনে এক কাঠা আয়তনের জমিটি কাউকে বিক্রি করে তারা যেন এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন, সেজন্যই ‘পুলিশকে দিয়ে কেউ’ তাদের হয়রানি করাচ্ছে।

পল্লবী থানার দুই এসআই ওই পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করলেও ওসি বলেছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পল্লবীর ই ব্লকের ১১ নম্বর সেকশনে ৫৪/এ/২ নম্বর হোল্ডিংয়ে ওই জমি ও বাড়ির মালিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. মাইনউদ্দিন মিজি (৮০) ও তার স্ত্রী রহিমা খাতুন (৭৫)।

প্রায় তিন দশক আগে বাস্তুহারাদের জন্য সরকারের দেওয়া ‘স্বল্পমূল্যের’ ওই জমি তারা কেনেন। চার ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সেখানেই তারা বসবাস করে আসছেন।

রহিমা খাতুন বলছেন, ওই জমিতে টিনের ঘর তুলে বহু বছর ধরে তারা ভাড়া দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি উঠে যায় বলে এ বছর ঘর ভেঙে এক তলা পাকা দালান তোলার প্রস্তুতি নেন।

“এর মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর দুই যুবক এসে বাড়ি বানানোর জন্য চাঁদা দাবি করে আমার স্বামীর কাছে। কিন্তু উনি দিতে রাজি হননি। তারপর গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে পল্লবী থানার পুলিশ হঠাৎ আমাদের বাসায় এসে কাশেম নামের এক ভাড়াটিয়াকে ইয়াবাসহ আটক করে।”

রহিমা খাতুন বলেন, ওই সময় তার ছোট মেয়ে ময়না খাতুন (২৫) সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল বলে তাকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। ঘটনা শুনে ময়নার বড় বোন লাভলী খাতুন (৩৫) পল্লবী থানায় গেলে তাকেও আটক করে রাখে পুলিশ।

পরে আড়াইশ গ্রাম হেরোইন বহনের অভিযোগে মামলা করে পুলিশ দুই বোনকে কারাগারে পাঠায় বলে জানান রহিমা।

তার অভিযোগ, ৪ অক্টোবর দুপুরে ‘পুলিশের সোর্স’ পরিচয় দিয়ে দুই যুবক তাদের বাড়িতে যায়। কিন্তু মাইনউদ্দিন ছাড়া কাউকে না পেয়ে চলে যায়।

রহিমা বলেন, ওই যুবকদের একজন সন্ধ্যায় আবারও বাসায় যায় এবং তার হাতে ১০০ টাকার কয়েকটা নোট এবং কয়েকটা বড়ি ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত চলে যায়।

কয়েক মিনিটের মধ্যে পল্লবী থানার এসআই রাজিব কুমার দাস ওই বাসায় যান এবং ‘ইয়াবা বিক্রির’ অভিযোগে রহিমাকে আটক করে নিয়ে যান বলে তার মেজো ছেলে মুদি দোকানী মামুন মিজির ভাষ্য।

রহিমা খাতুন বলেন, “থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় এসআই রাজিব বলে, পাঁচ লাখ টাকা না দিলে পুরো পরিবারের নামে হেরোইন বিক্রির মামলা দেবে। বললাম, স্বামী চোখে দেখে না, ছেলেরা ছোটোখাটো ব্যবসা করে, এত টাকা কোথায় পাব? এসআই রাজিব তখন বললো- ‘তোমার জমির তো দাম আছে। সেটা আমার কাছে বিক্রি করে দাও।”

রহিমার আরেক ছেলে সুমন মিজি বলেন, ওই রাতে তারা ধার দেনা করে ৮৫ হাজার টাকা জোগাড় করে পুলিশকে দিয়ে তাদের মাকে ছড়িয়ে আনেন।

“এখন আমরা প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছি, যদি পুলিশ এসে আবারও টাকা চায় কিংবা বাসায় মাদক পাওয়ার নাটক সাজিয়ে আবার কাউকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়…।”

রহিমা খাতুন বলেন, “টাকা নেওয়ার পর আমাকে ওসি স্যারের রুমে নিয়ে গিয়ে সব দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বললো। আমি কোনো দোষ না করেও ক্ষমা চেয়েছি। কারণ আমার বৃদ্ধ স্বামী, দুই মেয়ে, ছয় বাচ্চাকে দেখার কেউ নাই। পরে ওসি স্যার দয়া করে আমাকে আটক না করে চলে আসতে দিয়েছেন।”

এই বৃদ্ধা বলছেন, জমির লোভে কেউ তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে চায়। সে কারণে ‘পুলিশকে দিয়ে’ এসব করাচ্ছে বলে তার মনে হচ্ছে। তবে সন্দেহভাজন হিসেবে কারও নাম তিনি বলেননি।

স্থানীয়রা যা বলছে

এই পরিবারের অভিযোগ এবং পুলিশের ভাষ্য নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হয়।

রহিমাদের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে জাবেদ হেয়ার স্টাইলের মালিক মো. জাবেদ বলেন, তাদের এলাকায় রাতে মাদকের কেনাবেচা হয় বলে তিনি শুনেছেন। তবে কারা তাতে জড়িত তা বলতে পারবেন না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ওই বাসার কেউ মাদক ব্যবসা করে, এমন কথা আমি কখনো শুনিনি।”

ময়না ও লাভলীর বিরুদ্ধে পল্লবী থানার পুলিশ মাদক আইনের যে মামলা করেছে, সেখানে সাক্ষী করা হয়েছে তাদের প্রতিবেশী শাহীদা বেগমকে।

সেদিন কী ঘটেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ময়নারা এলাকায় মাদক ব্যবসা করে- এরকম কথা আমি শুনিনি। ওইদিন ময়নার মা, লাভলী আপা আর আমি থানায় ময়নার জন্য খাবার নিয়ে গেছিলাম। পরে শুনলাম পুলিশ আমাকে মামলার সাক্ষী বানাইছে। ঘটনা সম্পর্কে আমি তো কিছুই জানি না, সাক্ষী কীভাবে হলাম!”

১৯৯২ সাল থেকে ওই এলাকায় মুদি ব্যবসা করেন মো. মোকছেদ আলী। তিনি বলেন, “মাইনউদ্দিন আর রহিমাদের বাসায় মাদক বিক্রি হয়- এইটা আমি কোনোদিন শুনি নাই। পুলিশ কেন দুই মেয়েকে ধরে নিয়ে গেল সেইটা পুলিশই ভালো বলতে পারবে।”

পুলিশ যা বলছে

হেরোইন পাওয়ার অভিযোগে ময়না ও লাভলীর বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় যে মামলা হয়েছে, তার বাদী ওই থানার এসআই আসিফ ইকবাল।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ওইদিন হেরোইনসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এক মাদক ব্যবসায়ী তখন পুলিশের ওপর হামলা করে পালিয়ে যায়। ওদের পুরো পরিবার মাদক ব্যবসায় জড়িত।”

এসআই আসিফ ইকবাল বলছেন, কাশেম নামে কাউকে সেদিন ওই বাড়ি থেকে পুলিশ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করেনি।

রহিমা খাতুনের পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মামলার বাদী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে পল্লবী থানা এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে বহু অভিযান চালানোর কারণে অনেকেই আমাদের বিরুদ্ধে বলে। তারা বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”

পল্লবী থানার এসআই রাজিব কুমার দাস ওই পরিবারের কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলছেন, ১১টি ইয়াবা পাওয়ায় রহিমা খাতুনকে তিনি সেদিন থানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে ‘ওসি স্যার’ মানবিক কারণে তাকে ছেড়ে দেন।

“কারো কাছ থেকেই পুলিশ টাকা নেয়নি। জমি দাবি করার অভিযোগও সত্য নয়। তাদের জমি আছে কিনা- সেটাই তো আমি জানি না।”

অবশ্য পল্লবী থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম অভিযোগ স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেননি।

তিনি বলেন, “এই থানা এলাকায় ৮২ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। হাতের পাঁচ আঙ্গুল যেমন এক না, তেমনি সব কর্মকর্তাও এক ধরনের না। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, বৃদ্ধা রহিমা খাতুন ‘ভুল হয়েছে’ স্বীকার করে তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। মাদক ব্যবসায় জড়িত না বলেও দাবি করেছিলেন।

“তাই মানবিক কারণে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এজন্য তার থেকে পুলিশের কেউ টাকা নিয়ে থাকলে আর সেটা প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment