পুরাতন বিমানে চলছে ইউএস-বাংলা ॥ প্রশাসনের নীরবতা প্রশ্নবিদ্ধ

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস ॥ পুরাতন বিমান দিয়েই চলছে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট কার্যক্রম। একের পর এর দুর্ঘটনা আর সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে যাত্রীরা। প্রশ্ন উঠেছে বার বার দুর্ঘটনা ঘটার পরও কেন ছাড় দেওয়া হচ্ছে ইউএস-বাংলাকে !

নোজ গিয়ার বা সামনে চাকা না খোলায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করা ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটির দেড়শর বেশি আরোহীর প্রাণ বেঁচেছে বৈমানিকের দক্ষতায়।

মারাত্মক দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকলেও ইউএস-বাংলার বোয়িং ৭৩৭-এইটকিউএইট উড়োজাহাজের বৈমানিক স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) জাকারিয়া দক্ষতার সাথে নোজ গিয়ার ছাড়াই শুধু পেছনের চাকায় ভর করেই অবতরণে সক্ষম হন।

এ ঘটনায় ৪০ জন যাত্রী সামান্য আহত এবং ৭০ জন সাময়িকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত (ট্রমা) হলেও তারা বর্তমানে সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন।

বুধবার বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইট বিএস ১৪১ কক্সবাজারে নামার কথা ছিল বেলা সাড়ে ১২টায়।

কক্সবাজারের আকাশেই নোজ হুইল কাজ নার বিষয়টি বুঝতে পারেন বৈমানিক। পরে উড়োজাহাজটি চট্টগ্রামে উড়িয়ে নিয়ে এসে বেলা ১টা ২০ মিনিটে শাহ আমানত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করান।

ওই ফ্লাইটে ১৬৪ জন যাত্রী এবং ৭ জন ক্রু ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে ১১ জন ছিল শিশু।

শাহ আমানতের সারোয়ার ই জাহান বলেন, “নোজ গিয়ার দুইভাবে খোলা যায়। হাইড্রোলিক ও ম্যানুয়াল। কোনোটাই কাজ না করায় জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এটা টেকনিক্যাল ল্যান্ডিং।

“এভাবে সামনের চাকা ছাড়া অবতরণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো ধরনের বড় দুর্ঘটনা হতে পারত।”

তিনি বলেন, “এটা একটা টেকনিক্যাল ফল্ট। পাইলট অত্যন্ত দক্ষ। তিনি গতি একদম কমিয়ে বিমানটি অবতরণ করাতে সক্ষম হয়েছেন বলেই বড় কোনো বিপদ হয়নি।”

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ শাখার জিএম কামরুল ইসলাম বলছেন, উড্ডয়নের আগে সব ধরনের কমপ্লায়েন্স ক্লিয়ারেন্স পেলে ইঞ্জিনিয়ারের সার্টিফিকেট নিয়েই বিমান ছাড়া হয়। এই ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে সবই করা হয়েছে। কিন্তু নোজ গিয়ার না খোলার এই টেকনিক্যাল সমস্যা যেকোনো সময়ই হতে পারে। কক্সবাজারে জরুরি অবতরণের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে আসতে হয়েছে।”

নিরাপদ জরুরি অবতরণের জন্য তিনিও বৈমানিককে কৃতিত্ব দিয়েছেন।

“পাইলটের দক্ষতা, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার কারণেই কোনো বড় সমস্যা হয়নি। উনি সবদিক বিবেচনা করে দক্ষতার সাথে অবতরণে সক্ষম হয়েছেন।”

তবে এই ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউএস-বাংলার বিমান পরিচালনা বিষয়ে নানা বিরূপ মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ইউএস-বাংলার ফেইসবুক পেইজ থেকে দেওয়া অফিসিয়াল বক্তব্যেও অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

উড়োজাহাজটির জরুরি অবতরণের বিষয়টি বৈমানিক জাকারিয়া আগেই জানিয়েছিলেন শাহ আমানত কর্তৃপক্ষকে।

বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সারোয়ার ই জাহান বলেন, “নোজ গিয়ার যে খুলছে না সেটা আগেই আমাদের জানানো হয়েছিল।

“জরুরি অবতরণ করতে হবে সেটাও পাইলট জানিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী বিমান বাহিনী, চট্টগ্রাম বন্দর এবং ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম শহরের সবগুলো ইউনিটকে অবহিত করা হয়েছিল।”

শেষপর্যন্ত উড়োজাহাজটি রানওয়েতে সামনের চাকা ছাড়াই নেমে আসে। এরপর ধীর গতিতে সেটি এগোতে থেকে। এক পর্যায়ে সামনের অংশ মাটিতে ঝুঁকে পড়ে এবং ধোঁয়া বেরুতে থাকে।

ভিডিওতে দেখা যায়, উড়োজাহাজটি রানওয়েতে নামার সাথে সাথেই ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন গাড়ি চলতে শুরু করেছে।

থামার পর উড়োজাহাজের সামনের ও পেছনের দরজা আরোহীদের নেমে আসার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে।

তখন এক নারী চিৎকার করে কাঁদছিলেন। আরেকজন নামার পর মাটিতে বসে পড়েন।

এসময় বিমান বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী কর্মীরা এগিয়ে আসেন। তারা যাত্রীদের অ্যাম্বুলেন্স ও অন্য গাড়িতে করে নিয়ে যান।

উড়োজাহাজের যাত্রী এনজিওকর্মী মো. মানিক সাংবাদিকদের বলেন, “বিমানটি যখন কক্সবাজার নামতে পারেনি তখনো আমাদের কিছু বলা হয়নি। এরপরও সেটি আধ ঘণ্টার মত আকাশে ছিল।

“চট্টগ্রামে নামার সময় ঝাঁকুনি দিলে যাত্রীরা কান্না করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে ঝাঁকি দিয়ে বিমানটি থামে। তখন ধোঁয়া দেখতে পাই। পরে পেছনের দরজা দিয়ে নেমে আসি।”

আরেক যাত্রী সাভারের সাবেক সাংসদ তালুকদার মো. তৌহিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নেপালের ঘটনা থেকে ইউএস-বাংলার শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। সরকারের উচিত এই বিমান সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

উড়োজাহাজ থেকে নেমে আসার পর দেখা গেছে, যাত্রীদের মধ্যে কারো হাত-পা ছড়ে গেছে। দুয়েকজনের ক্ষত থেকে রক্ত পড়তেও দেখা গেছে। ঝাঁকুনির কারণে কোনো কোনো যাত্রী হাত-পায়ে ব্যথা পান।

উড়োজাহাজের জরুরি অবতরণের খবর পেয়ে বেলা পৌনে তিনটার দিকে চিকিৎসকদের একটি দল নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছান চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, ৪০ জন যাত্রী সামান্য আহত হয়েছেন। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের আঘাত গুরুতর নয়।

“এছাড়া ৭০ জন যাত্রী ট্রমায় আক্রান্ত হন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তাই ভয়ে তারা সাময়িকভাবে ট্রমাটাইজ হয়েছিলেন। তাদের সাথে কথা বলেছি, তারাও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছেন। বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর এধরনের ট্রমা হতে পারে।”

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment