শান্তি মিশনের ব্যর্থতায় শাস্তি

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস ॥ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কর্মরত সদস্যদের ব্যর্থতার দায়ে সংশ্লিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিতের প্রস্তাব করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিষদে এ সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাবটির বিষয়ে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য হিসেবে সংঘাতপ্রবণ এলাকায় নিয়োজিত সদস্যরা সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত তো দূরের কথা অনেক সময় নিজেরাই নিপীড়ন শুরু করে। এমন ব্যর্থতার জন্য সুস্পষ্ট শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। শাস্তি হিসেবে অভিযুক্ত শান্তিরক্ষীদের সরাসরি দেশ ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশের শান্তিরক্ষা মিশন বাবদ পাওনা অর্থ পরিশোধ না করার ধারা রয়েছে ওই প্রস্তাবনায়। মার্কিন প্রস্তাবে দ্বিমত প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। ‘তথাকথিত ব্যর্থতার’ জন্য শান্তিরক্ষী বা সংশ্লিষ্ট দেশ নয় বরং যথাযথ সরঞ্জাম ও যথেষ্ট সংখ্যক শান্তিরক্ষী না থাকাকে দায়ী করে বাংলাদেশ বলেছে, মার্কিন প্রস্তাব পাস হলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই হাসিল হবে, শান্তি রক্ষার মিশন নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রস্তাবনার বিষয়ে চীন-রাশিয়া-পাকিস্তানও দ্বিমত পোষণ করেছে।

জাতিসংঘকে মোতায়েনকৃত শান্তিরক্ষীদের কর্মকাণ্ডে সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ যেমন রয়েছে তেমনি সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার দায়েও তারা অভিযুক্ত। বুধবার জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি নিরাপত্তা পরিষদের এক সভায় বলেছেন, শান্তিরক্ষার মূল সূত্র হচ্ছে রক্ষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা আস্থার সম্পর্ক। যখন আস্থাই নষ্ট হয়ে যায় তখন শান্তিরক্ষা মিশন বিফল হতে বাধ্য। তার ভাষ্য, ‘নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, যাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা তাদের দ্বারাই হামলা, হয়রানি ও শোষণের শিকার হওয়া।’ এমন পরিস্থিতিতে থেকে মুক্তি পেতে যুক্তরাষ্ট্র একটি খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করেছে দেশটির দাবি অনুযায়ী তা জাতিসংঘের সচিবালয়কে শক্তিশালী করবে এবং শান্তিরক্ষীদের দক্ষতা বৃদ্ধি তরান্বিত করতে ভূমিকা রাখবে।

মার্কিন খসড়া প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শান্তিরক্ষীদের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সময় মতো প্রতিবেদন দাখিল, ব্যর্থতার শাস্তি প্রদান এং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারলে সুস্পষ্ট পুরস্কারের ব্যবস্থা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এসবের পাশাপাশি মোতায়েনকৃত শান্তিরক্ষীদের দক্ষতা আদৌ বেড়েছে কি না নির্ণয় করতে ‘তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নের গুরুত্ব’ স্বীকার করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে মার্কিন প্রস্তাবনায়।

বাংলাদেশকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান রাখা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি আখ্যা দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, যথাযথ সরঞ্জাম ও যথেষ্ঠ সদস্য থাকা না থাকার সঙ্গে দক্ষতার ওতোপ্রতোভাবে জড়িত থাকার দাবি করে বাংলাদেশ বলেছে, ব্যর্থতার শাস্তি হিসেবে পাওনা অর্থ কেটে রাখা ও সদস্য নেওয়া কমানোর মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে। কিন্তু শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর মূল লক্ষ্য তাতে অর্জিত হবে না।
নিরাপত্তা পরিষদের লক্ষ্য আরও স্পষ্ট ও বাস্তবানুগভাবে নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। দুই দেশই পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ এবং যথেষ্ঠ শান্তিরক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিতকে জরুরি বলে মনে করে। অর্পিত দায়িত্বের তুলনায় রিসোর্স না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে পাকিস্তান জানিয়েছে, দক্ষিণ সুদানের শান্তিরক্ষা মিশনে ২০৯টি কাজের ভার দেওয়া হয়েছিল শান্তিরক্ষীদের।

ব্যর্থতা বা দক্ষতার অভাবে শাস্তি দেওয়ার মার্কিন প্রস্তাবের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে রাশিয়া-চীনও। দেশ দুইটির ভাষ্য, যারা শান্তিরক্ষা মিশনে সদস্য পাঠায় আগে তাদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল।  বুধবার রাশিয়া সরাসরিই নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে বলেছে, অপেক্ষাকৃত নরম শর্তে ওই প্রস্তাবনাকে সমর্থন করা যেতে পারে। অর্থাৎ শান্তিরক্ষীদের দক্ষতা বৃদ্ধির শর্ত না দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা উল্লেখ করে প্রস্তাব উত্থাপন করা যেতে পারে।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে যৌন শোষণ থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়ে যেসব অভিযোগ এসেছে সেসবের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তোনিও গুতেরেস অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের কাজ করছেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান জিন পিয়েরে ল্যাকরক্স দক্ষতাকে একটি ‘যৌথ অর্জন’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, জাতিসংঘের সংস্কার পরিকল্পনাগুলো প্রকৃতপক্ষে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘এখনও অনেক কাজ বাকি। তবে আমরা ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত সংস্কার কর্মসূচির কিছু সাফল্য দেখতে পারছি।’

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment