‘অবৈধ সম্পদ’ হস্তান্তর করছেন ফালু !

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস ॥ মোসাদ্দেক আলী ফালু বিদেশে অবস্থান করে বাংলাদেশে থাকা তার ‘অবৈধ সম্পদের’ হস্তান্তর করছেন বলে সন্দেহ করছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা।

সাবেক এই সংস সদস্য ও ব্যবসায়ী তার পাঁচটি ফ্ল্যাট, একাধিক বাড়ি ও জমি দুই ভাতিজার নামে লিখে দিয়েছেন বলে একটি অভিযোগ পেয়ে তার অনুসন্ধানে নেমেছেন তারা।

মঙ্গলবার কমিশন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছে বলে কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব ফালু বর্তমানে দুবাই রয়েছেন বলে দুদক কর্মকর্তারা জানান।

দুদকে অভিযোগ আসে, ফালু দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে দলিলের মাধ্যমে দুই ভাতিজাকে দিয়ে দিয়েছেন।

এসব দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে আমিরাতে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগে পেয়েছে দুদক।

এ বিষয়ে দুদক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা চাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে বলে দুদকের ওই কর্মকর্তা জানান।

জানা গেছে, পুঁজিবাজার থেকে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভির মালিক মো. মোসাদ্দেক আলী ফালু জড়িত থাকার অভিযোগ অনুসন্ধান করবে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও অনুসন্ধান করবে সংস্থাটি।
দুদকে আসা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এপিএস ও সাবেক সাংসদ মো. মোসাদ্দেক আলী ফালু বিভিন্ন ব্যবসার নামে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। অপরদিকে বিভিন্ন দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে বাজার হতে শত শত কোটি আত্মসাত করেছেন।
দুদক সূত্র জানায়, গত ১৭ মে আসা এই অভিযোগ আমলে নিয়ে যাচাই-বাছাই করে দুদক। যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগটি যথাযথ বলে মনে হওয়ায় অনুসন্ধানেরর সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। একই সঙ্গে অনুসন্ধান কাজটি তদারকি করার জন্য দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে মোসাদ্দেক আলী ফালু বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছেন কি না তা দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ছিলেন স্রেফ ‘ফালু’, হয়েছেন ‘মোসাদ্দেক আলী ফালু’। অথচ তিনিই আজ বিএনপির সবচেয়ে ‘রহস্যপুরুষ’। খালেদা জিয়ার পরই তাকে দলটিতে সবচেয়ে ক্ষমতাধর বলে ধরে নেয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সত্তরের দশকে রাজধানীর শাহজাহানপুরের কবরস্থানের দেখাশোনা করার কাজ করা ‘ফালু’ আজ দেশের অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র। ঢাকার এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা মির্জা আব্বাসের মিটিং মিছিলের লোক সরবরাহ করে তিনি বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মে জড়িয়ে পড়েন।
সময়টা এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের, রাজপথে পুলিশী অ্যাকশন প্রতিরোধ করতে সে সময়ের বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ওপর আক্রমণ নিজের উপর নিতেই লাইমলাইটে চলে আসেন ফালু। সেদিন ফালুর ওই উদারতার জন্য তাকে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। হয়েছেন তিনি সংসদ সদস্য, দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অশরীরী ক্ষমতাবান চরিত্র। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিনী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে থাকাকে অর্থাৎ জিয়াউর রহমানকে অবমূল্যায়ন করার নেপথ্য নায়কও এই মোসাদ্দেক আলী ফালু।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হন ফালু। এ সময় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের নেতাদের নজরে আসেন।
সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হওয়ায় অনেকেই ফালুকে দিয়ে প্রয়োজনীয় ফাইলে সই করিয়ে নেন। এভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা মোসাদ্দেক আলী ফালু বিএনপিতে ‘তারকা’ নেতা হন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তার সঙ্গে চলে যান বিএনপির এমপি মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ও মাহী বি চৌধুরী। তারা সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মেজর (অব.) মান্নানের ছেড়ে দেয়া আসন তেজগাঁ এ উপনির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফালু। এমপি হওয়ার পর তিনি আরো গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। পরে তিনি একাধিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য মায়ের নামে এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করে জনসেবায় মন দেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের অধিক আস্থাভাজন হওয়ায় বিদেশি দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ তার বেড়ে যায়। ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে তিনি গড়ে তোলেন সুসম্পর্ক।
বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রিয় মানুষ হওয়ায় প্রশাসনকে ব্যবহার করে রাতারাতি ব্যবসায় ফুলিয়ে ফাপিয়ে তোলেন তারকা নেতা ফালু। সেই ধারা অব্যাহত রাখতে বিগত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সময়ও ব্যবসার সদস্য হওয়ার পরও তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ব্যবসায়িক সখ্য গড়ে তোলেন। বিদেশি একটি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তার ব্যবসার কলেবর বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তিনি শেয়ার ব্যবসা করেও আলোচিত হন। জানা যায়, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতাদের তালিকায় তারও নাম ছিল।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে টেলিভিশনের মালিকরা ‘টেলিভিশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ’ গঠন করে। সরকারের আস্থাভাজন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা টেলিভিশন মালিকদের সংগঠনের সভাপতি হতে না পারলেও মোসাদ্দেক আলী ফালুকে ওই সংগঠনের সভাপতি করা হয়। অথচ এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন কামাল আহমদ মজুমদার এমপি, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, গোলাম দস্তগীর গাজী, একে আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনখ্যাত ড, মাহফুজুর রহমান প্রমুখ। এদের কেউ সভাপতি না হতে পারলেও জাদু বলেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত মোসাদ্দেক আলী ফালু সংগঠনের সভাপতি হন।
সূত্রমতে, সক্রিয় রাজনীতিতে দেখা না গেলেও ফালু বিএনপির রাজনীতির আসল ‘তারকা’। বিএনপির অনেক নেতাই মনে করেন গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া এবং শীর্ষ নেত্রীর সুদৃষ্টি পেতে ফালুর সুপারিশের বিকল্প নেই। ছাত্রদল থেকে শুরু করে সব অঙ্গ সংগঠনের প্রায় একই অবস্থা। কেন্দ্রের প্রভাবশালী জাঁদরেল নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতারা পদপদবি আর সুপারিশের জন্য ছোটেন তার কাছে।

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment