পল্টনের প্রীতম জামান টাওয়ারে চলছে জুয়াযজ্ঞ

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস্‌ ॥ শতাধিক কম্পিউটারের সামনে চেয়ারে বসে আছে কিশোর, তরুণ, যুবক এমনকি মধ্যবয়সী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মাউসের বাটনে তাদের হাত, চোখ মনিটরে। এদিক-সেদিক তাকানোর ফুরসত নেই। নিবিড়ভাবে জুয়া খেলছে তারা। ঢাকার পুরানা পল্টনের ৩৭/২ প্রীতম জামান টাওয়ারের ১৩ ও ১৪ তলায় ঢুকে এই জুয়াযজ্ঞ দেখে যে কারো চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে।

সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিরতিহীনভাবে চলছে জুয়ার আসর। কেউ কম্পিউটারে আবার কয়েকজন মিলে গ্রুপ করে অনেকটা প্রকাশ্যেই জুয়ার কোর্টে টাকা ছড়িয়ে খেলছে। আজিজ নামের এক কিশোর এগিয়ে এসে বলল, ‘ভাই, খেলবেন নাকি? ১০০, ৫০০, এক হাজার থেকে এক লাখ, যত খুশি খেলতে পারেন। সেই সঙ্গে বাড়তি ব্যবস্থাও আছে।’ বাড়তি ব্যবস্থাটা কী জানতে চাইলে, কিশোরটি মুখ কানের কাছে এনে বলে, বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবস্থাও আছে।

নতুন খেলোয়াড় পরিচয়ে রুমের ক্যাশিয়ার একরামুলের কাছে নিয়ম-কানুন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভিআইপি ক্যাটাগরিতে সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার ও এক লাখ টাকা (জুয়াড়িদের ভাষায় একে বলে বেটিং) একবারে খেলতে পারেন। আর ভিআইপি রুমের বাইরে কম্পিউটারে খেললে সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেটিং করতে পারেন।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চক্রটি ডেস্কটপের পাশাপাশি জুয়াড়িদের নিজস্ব ল্যাপটপ, এমনকি মোবাইল ফোনে সফটওয়্যার ডাউনলোড করে ঘরে ঘরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে জুয়া। এতে আসক্ত হয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সর্বস্বান্ত হচ্ছে বিভিন্ন বয়সের মানুষ। আর অনলাইন ক্যাসিনোর এই ফাঁদ পেতে বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।

প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লাখ লাখ টাকার জুয়ার আসর বসে প্রীতম জামান টাওয়ারে। সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী, ঘুষখোরসহ কোটিপতি ব্যবসায়ীরাও এখানে জুয়া খেলতে আসে। তবে তারা কেউই খেলায় জিতে এখান থেকে টাকা নিয়ে বের হতে পারে না। ফাঁদে আটকা পড়ে আবার খেলতে বসে সব হারায়। পুলিশের কাছে তথ্য থাকলেও প্রভাবশালীদের কারণে এই জুয়া-মাদক আসরের নেপথ্যের কুশীলবদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

জানা গেছে, বাংলাদেশের কয়েকজন প্রভাবশালীর সঙ্গে ট্যুরিস্ট ভিসায় আসা চীনা বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ার চার নাগরিক এই ক্যাসিনোর প্রধান নিয়ন্ত্রক। সাত মাস ধরে তাদের এই কর্মকাণ্ডে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করা ঢাকার এক বড় জুয়াড়ি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন বলেন, “তিন মাস ধরে মতিঝিল এলাকায় একটি বহুতল ভবনে নতুন ‘ক্যাসিনো’র তথ্য পাওয়া গেছে। আমরাও এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রাথমিক খোঁজ নিয়েছি। এদের কাগজপত্রে ত্রুটি আছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৬ অক্টোবর প্রীতম জামান টাওয়ারের ১৪ তলায় এই অনলাইন ক্যাসিনো বসানো হয়। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইনের নামকরা ক্যাসিনোর সঙ্গে সার্ভার লিংকের মাধ্যমে সরাসরি এই খেলা চালানোর মিথ্যা প্রলোভন দেওয়া হয় জুয়াড়িদের। কিন্তু বাস্তবে সফটওয়্যার কারসাজির মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় সব কিছু। ব্যাংকার-প্লেয়ার, রোলেট, ড্রাগন টাইগার ও সিক বো নামের চারটি খেলা চালানোর জন্য প্রথমে ৪৯টি কম্পিউটার বসানো হয়। কিন্তু দ্রুত জুয়াড়িদের ভিড় বাড়ায় গত মাস থেকে একই ভবনের ১৩ তলায় আরো ৩৬টি কম্পিউটার বসায় চক্রটি। এর মধ্যে ১৩ তলায় কাচঘেরা ছোট আলাদা পাঁচটি কক্ষে বসানো দুটি করে আলাদা কম্পিউটারে ভিআইপিরা জুয়া খেলে। আরো ২৬টি কম্পিউটারে বিশেষ শ্রেণির লোকজন জুয়া খেলে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জুয়াড়িরা ক্যাশ কাউন্টারে টাকা জমা দিলেই তা সরবরাহ করা হয় নির্ধারিত কম্পিউটারে। এরপর চলতে থাকে খেলা। জুয়াড়িদের আস্থা অর্জনে হাতে গোনা দু-চারজনকে বড় অঙ্কের টাকা জিতিয়ে দেওয়া হয়। ভিআইপি রুমে খেলার ফাঁকে একজন জানান, বেশির ভাগ সময়েই বড় অঙ্কের টাকা হেরে যান তিনি। কখনো কখনো তিন ঘণ্টা খেলে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হেরেছেন তিনি। মাঝেমধ্যে দু-এক দিন হঠাৎ হঠাৎ পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জিতেছেন, তবে সে টাকা নিয়ে বাইরে বের হতে পারেননি। জুয়াড়িদের ফাঁদে পড়ে আবার খেলতে বসেই হেরে গেছেন।

বাসায় বসে খেলার নিয়ম জানতে চাইলে ক্যাশ কাউন্টারে বসা শরীফ নামের আরেক যুবক বলেন, যিনি বাসায় বসে খেলতে চান তিনি নির্ধারিত টাকা ক্যাশ কাউন্টারে জমা দেন। এরপর তাঁকে একটি সদস্য পরিচিতি নম্বর ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়। সেই আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তিনি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে ঢুকে বাসায় বসেই ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কিংবা স্মার্টফোনে খেলতে পারেন। এরই মধ্যে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের কয়েক হাজার জনকে বাসায় বসে খেলার ব্যবস্থা করে দিয়েছে তারা।

১৪ তলার ক্যাশিয়ার জানান, তাঁর তলায় এখানে একযোগে ৪৯ জন বসে খেলতে পারেন। তবে ১৩ তলার চেয়ে ১৪ তলায় খেলে অপেক্ষাকৃত ছোট জুয়াড়িরা। এখানে সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা ক্যাশ কাউন্টারে জমা দিলেই খেলতে পারে যে কেউ। জুয়ার আসরের সুপারভাইজর রবিউল হোসেন বলেন, খেলতে গিয়ে কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক তার সমাধান দেন কক উইং পিং নামের একজন। ভ্রমণ ভিসায় তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তিনি মূলত সার্বক্ষণিক ল্যাপটপের মাধ্যমে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। কোনো জুয়াড়িকে কখন জেতাতে হবে তা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ঠিক করে দেন। অনুমোদন ছাড়া কিভাবে এই ক্যাসিনো চালাচ্ছেন, জানতে চাইলে কোনো সঠিক জবাব দিতে পারেননি সুপারভাইজর।

জানা গেছে, চক্রটি গত চার মাসে এই জুয়া প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। প্রীতম টাওয়ারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব কিছুই জানে। মাঝেমধ্যে তাদের লোকজন খোঁজখবর নেয়।

ইন্টারনেট ব্যবহার করে এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড চলতে পারে কি না, জানতে চাইলে বিটিআরসির এক কর্মকর্তা বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহার করে অবৈধ এমন কাজ চললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের নিরাপত্তার জন্যও এটি ঝুঁকিপূর্ণ। এলাকাবাসী জানায়, রাত-দিন সমানতালে জুয়ার আসর চলায় পুরানা পল্টন এলাকায় চলাচলকারী মানুষ এখন নিরাপদ নয়। এখানে বেড়ে গেছে ছিনতাই তৎপরতা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার জুয়া সিন্ডিকেটের চার সদস্য ইয়ং উইং হং, টং খা চিয়ান, কক উইং পিং এবং লাও ফুক চিংকে গত আগস্ট মাসে ঢাকায় নিয়ে আসেন এক শীর্ষ ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী পরিচয়ের আড়ালে ঢাকার ক্লাবপাড়ায় বড় জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিতি আছে তাঁর। অবৈধভাবে টাকা পাচার করে মালয়েশিয়ায় তিনি সেকেন্ড হোমও করেছেন। সে দেশের ক্যাপং এলাকায় রয়েছে তাঁর বাড়ি ও একাধিক গাড়ি।

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment