এবিসি রেডিওর রাদবি রেজাই প্রতারক ‘টেরট বাবা’

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস্‌ ॥ বেসরকারি এফএম রেডিও (ফ্রিকোয়েন্সি মডিউলেশন) চ্যানেল এবিসিতে ভৌতিক গল্প শোনানোর অনুষ্ঠান ‘ডর’ প্রচারিত হতো। ওই অনুষ্ঠানের সূত্রে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘প্যারানরমাল রিসার্চার’ হিসেবে যোগ দেন এম এম জাহাঙ্গীর রেজা ওরফে রাদবি রেজা। অনুষ্ঠানটিতে তিনি মানুষের নানা সমস্যার সমাধান পর্ব ‘টেরট কার্ড সেগমেন্ট’ চালু করে দেন। নাম ও ফোন নম্বর দিয়ে সাধারণ মানুষকে এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হতো। এই নাম-পরিচয় অনুযায়ী ফেসবুকে সার্চ করে আগেই আগ্রহী শ্রোতার ব্যক্তিগত তথ্য জেনে নিতেন রাদবি রেজা। পরে অনুষ্ঠান প্রচার ও ব্যক্তিগত তথ্য বলে দেওয়ার কারণে রেজার ভক্ত হয়ে যায় সমস্যাগ্রস্ত অনেক শ্রোতা। অনেকে তাঁকে অতিমানবীয় শক্তিধর ভাবতে শুরু করে। আর তাদের এই ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ভয়ংকর এক প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেন তিনি। নিজের নাম দেন ‘টেরট বাবা’।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ওয়েবসাইট ও ইউটিউবে জাদু দেখাতে শুরু করেন রেজা। সেখানে বলতেন, তিনি হাত দিয়ে জিন ধরে বোতলে ভরতে পারেন। শুধু তাই নয়, মাথায় বাতি জ্বালানো, খালি হাতে মোমবাতি জ্বালানো দেখাতেন। এই ক্ষমতা দিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার ‘সমাধান’ করতেন তিনি! লটারি জেতাতে পারেন, খেলার আগাম ফলও বলতে পারেন। ‘চিকিৎসা’ করতেন ক্যান্সার ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের। পরামর্শ ফি ছিল ঘণ্টায় ১০ হাজার ২০০ টাকা।

এক নারীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভয়ংকর এ প্রতারককে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অপরাধবিষয়ক দল। আদালতের নির্দেশে তাঁকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিজিটাল প্রতারক রাদবি রেজার বাড়ি সুনামগঞ্জে। থাকেন রাজধানীর ইন্দিরা রোডে। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন ইংল্যান্ডে। ২০১২ সালের ১৪ জানুয়ারি ২০টি চোরাই মোটরসাইকেলসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল শেরেবাংলানগর থানা-পুলিশ। রেজাকে প্রতারণায় সহায়তা করেছেন এবিসি রেডিওর এক জনপ্রিয় আরজে (রেডিও জকি)। এবিসি রেডিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে প্রতারণার বিষয়টি জানার পরই রেজাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ওই আরজেও এখন এবিসি রেডিওতে নেই।

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধবিষয়ক দলের প্রধান, বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এবিসি রেডিওতে প্রচার হওয়া ‘টেরট কার্ড সেগমেন্ট’ অনুষ্ঠান থেকেই প্রতারণার ফাঁদ পাতে রেজা। তাকে সহায়তা করেন ওই রেডিওর আরজে কিবরিয়া।’ তিনি বলেন, ‘ওই অনুষ্ঠানের শ্রোতাদের মধ্যে অনেক সরল মানুষ রেজার ভক্ত হয়ে যান। তাঁদেরই একজন এক নারীর সাংসারিক সমস্যা সমাধানের জন্য স্বপ্নে পাওয়া মুক্তাসহ আতর, আংটির প্রয়োজন হবে বলে জানান রেজা। এসব জিনিস দেওয়ার কথা বলে ওই নারীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন এই প্রতারক।’ মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রেজা নিজের একটি ওয়েবসাইট ও একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে দেখা করতে হলে ঘণ্টায় ১০ হাজার ২০০ টাকা করে নিতেন তিনি। এই টাকা বিকাশের মাধ্যমে অগ্রিম নিতেন তিনি।’

সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল প্রতারক রাদবি রেজার বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা তথ্য-প্রযুক্তি আইনের মামলায় তাকে রিমান্ডে আনা হয়েছে।

এবিসি রেডিওর হেড অব অপারেশন এহসানুল হক টিটু সাংবাদিকদের বলেন, প্রতারণার বিষয় ধরার পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাদবি রেজাকে ডর অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরজে কিবরিয়াও গত ডিসেম্বর মাসে এবিসি রেডিওর চাকরি ছেড়ে অন্য রেডিও চ্যানেলে যোগ দিয়েছেন।

Please follow and like us:
0

Related posts

Leave a Comment