যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ’র নিষেধাজ্ঞায় বাংলাদেশি জঙ্গি গোষ্ঠী ‘ আইএসআইএস – বাংলাদেশ ‘

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস্‌ ॥ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র দুই ব্যক্তি ও সাত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যার মধ্যে একটি বাংলাদেশি গ্রুপের কথাও বলা হচ্ছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ এই নিষেধাজ্ঞা দেয় বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়।

ট্রেজারি বিভাগের ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল বিভাগের ওয়েবসাইটে নিষিদ্ধ ব্যক্তির তালিকায় নাইজেরিয়ার নাগরিক আবু মুসাব আল-বার্নাবি এবং সোমালিয়ার মাহাদ মোয়ালিমের নাম যুক্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ, মিশর, ফিলিপিন্স, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার সাতটি গোষ্ঠীকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আনার কথা বলা হয়েছে সেখানে।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাংলাদেশি ওই জঙ্গি গোষ্ঠীর নাম আইএসআইএস-বাংলাদেশ; তাদের নেতার নাম আবু জান্দাল আল-বাঙ্গালি।

এর বাইরে আইএসআইএস-ইজিপ্ট, আইএসআইএস-ফিলিপিন্স, আইএসআইএস-সোমালিয়া, আইএসআইএস-ওয়েস্ট আফ্রিকা, জুন্দ আল-খলিফা-তিউনিসিয়া (আইএসআইএস-তিউনিসিয়া) এবং ফিলিপিন্সভিত্তিক মাউতি গ্রুপকে ওই তালিকায় যুক্ত করেছে ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন জঙ্গি হামলা ও হত্যার দায় স্বীকার করে আইএস এর পক্ষ থেকে বার্তা পাঠানো হলেও সরকার ও পুলিশ সবসময়ই সে দাবি নাকচ করে আসছে। পুলিশ বলে আসছে, এ দেশের উগ্রপন্থি দলগুলোই রয়েছে সেসব জঙ্গি কর্মকাণ্ডের পেছনে।

গৃহযুদ্ধ কবলিত সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তৃত অঞ্চল দখল করে ২০১৪ সালে ‘খেলাফত’ ঘোষণা করে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়ার (আইএসআইএস) আত্মপ্রকাশ ঘটে। ভিন্ন মতাবলম্বী ও পশ্চিমা নাগরিকদের শিরশ্ছেদসহ অন্যান্য নির্যাতনের ভিডিও-খবর বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায়।

এর মধ্যে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের পর ধারাবাহিকভাবে মুক্তমনা লেখক, ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও ভিন্ন মতাবলম্বীরা একই কায়দায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন।

ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ায় চেজারে তাভেল্লা নামের এক ইতালীয় এনজিওকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর পাঁচ দিনের মাথায় রংপুরের এক গ্রামে একই কায়দায় খুন হন জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি।

দুটি ঘটনার পরই আইএস (ইসলামিক স্টেট) হত্যার দায় স্বীকার করে বলে খবর দেয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ’।
সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের তরফ থেকে আইএস এর ওই দাবি নাকচ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বাংলাদেশে ‘আইএসের উত্থান’ ঠেকাতে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

এরপর ২০১৬ সালের ১ জুলাই শুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশিসহ অন্তত ২২ জন নিহত হন। জঙ্গি হামলার পর উৎকণ্ঠার রাত পেরিয়ে সকালে কমান্ডো অভিযানে হামলাকারীদের নির্মূলের পর সেখানে ভয়ানক ওই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তার আগে রাতেই সেখানে ২০ ‘জিম্মিকে’ হত্যার খবর আইএসের বরাত দিয়ে দিয়েছিল সাইট ইন্টেলিজেন্স।

দেশ-বিদেশে সাড়া ফেলা ওই ঘটনার তদন্তে গিয়ে পুলিশ সন্দেভাজন হামলার হোতাদের চিহ্নিত করার পর বলেছিল, তারা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবির নতুন সংস্করণ ‘নব্য জেএমবি’। এই গোষ্ঠীর সব সদস্যই নিজ দেশে বেড়ে ওঠা জঙ্গি।

এর আগেই ২০১৫ সালের শেষ দিকে আইএস এর মাসিক পত্রিকা ‘দাবিক’ এর একটি সংখ্যায় দাবি করা হয়, জঙ্গিরা বাংলাদেশে একজন ‘আঞ্চলিক নেতার অধীনে’ নতুন হামলার জন্য সংগঠিত হচ্ছে।

এরপর ২০১৬ সালের এপ্রিলে দাবিকের আরেক সংখ্যায় আইএসের বাংলাদেশ শাখার কথিত প্রধান শেখ আবু ইব্রাহিম আল-হানিফের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সেখানে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে চাপের মুখে থাকা জামায়াতে ইসলামীর তৃণমূল পর্যায়ের কিছু কর্মী আইএসে যোগ দিয়েছেন।

দাবিক এর ওই সংখ্যাতেই ‘আবু জান্দাল আল-বাঙ্গালি’ নামে ২৩ বছরের এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যুর খবর দিয়ে বলা হয়, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের প্রশিক্ষণের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।

আবু জান্দালের পরিচয়ে বলা হয়, তার বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন, যিনি ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহে নিহত হন।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে গুলশান হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শতাধিক ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করে, যারা বাড়ি পালিয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন বলে সন্দেহ করা হাচ্ছিল।

সে সময় র‌্যাবের প্রকাশ করা একটি তালিকায় ঢাকার কচুক্ষেতের আশিকুর রহমান জিলানী ওরফে আবু জান্দাল নামের একজনের তথ্য আসে, যার বাবা মশিউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল।

যুক্তরাষ্ট্র যে আবু জান্দাল আল-বাঙ্গালির কথা বলছে, সেই ওই একই ব্যক্তি কি না- তা স্পষ্ট নয়। কথিত আইএসআইএস-বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও এখনও পাওয়া যায়নি।

আলাদা এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, নতুন এসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছাড়াও ২০১১ সাল থেকে আইএস নেতা ও তাদের হয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী ৪০ জন ব্যক্তি-সংগঠন-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ঢুকতে না পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আইএসের ‘নিরাপদ স্বর্গ’ ধ্বংস, বিদেশি যোদ্ধাদের দলে ভেড়ানোর সুযোগ বন্ধ, অর্থের উৎস নির্মূল, ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়ায় তাদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা সীমিত করার পাশাপাশি ইরাক ও সিরিয়ার মুক্ত অঞ্চলে লোকজনের ফিরে যাওয়ায় সহযোগিতা করছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।

Please follow and like us:
0

Related posts

Leave a Comment