২২ দিনের জন্য ইলিশ ধরার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস, শফিকুল ইসলাম ॥ আজ (১অক্টোবর) থেকে আগামী ২২ অক্টোবর, এই ২২ দিনের জন্য দেশের নদ-নদীতে ইলিশ ধরার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। আগামী ২৩ অক্টোবর থেকে ফের শুরু হবে ইলিশ ধরার কাজ। মা ইলিশ রক্ষা ও স্বাচ্ছন্দে ডিম ছাড়ার সুযোগ করে দিতেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হামিদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপণে এ আদেশ জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপণে বলা হয়েছে, এই সময়ে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, খুলনা, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী এই ২৭ জেলার সব নদ-নদীতে ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে।

মৎস্য মন্ত্রণালয় দেশের নদনদীগুলোর সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভোলা জেলার মনপুরা, ঢলচর, নোয়াখালী জেলার হাতিয়ার কালিরচর ও মৌলভীর চরকে ইলিশের বিশেষ প্রজনন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার শাহের খালী হতে হাইতকান্দি পয়েন্ট, ভোলার তজুমুদ্দিন উপজেলার উত্তর তজুমুদ্দিন হতে পশ্চিমে সৈয়দ আওলিয়া পয়েন্ট, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতা চাপালি পয়েন্ট এবং কক্সবাজারের কুতুবদিয়া হতে গণ্ডামারা পয়েন্ট প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র।

উল্লেখ্য, গত বছর ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত (২২ দিন) ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল সরকার।

এবার ১২দিন আগেই ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার জারির বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-সচিব হামিদুর রহমান বলেন, ‘আশ্বিনের পূর্ণিমার ওপর নির্ভর করে এবার নিষেধাজ্ঞার তারিখ এগিয়ে এসেছে, তারিখটাই শুধু বদল হয়েছে। এছাড়া অন্য সব শর্ত ও করণীয় আগের বছরগুলোর মতোই বহাল রয়েছে।

২২ দিনে যা করণীয়

১. এই ২২ দিনে নদী বা সাগরে কোথাও ইলিশ ধরা যাবে না।

২. এই সময় ইলিশ মাছ বিতরণ করা যাবে না।

৩. পাইকারি বা খুচরা প্রক্রিয়ায় ইলিশ বিক্রি করা যাবে না।

৪. এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ইলিশ পরিবহন করা যাবে না।

৫. এই সময় ইলিশ মজুদ করা যাবে না।

৬. কোনও পণ্যের সঙ্গে ইলিশ বিনিময়ও করা যাবে না।

 

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলবে

১. নদীতে র‌্যাব, পুলিশ বা কোস্টগার্ডের অভিযান চলবে।

২. হাটবাজারে অভিযান চলবে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

৩. শহরের বিপণি বিতানগুলোতে (চেইন শপ) অভিযান পরিচালিত হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হক বলেন, ‘ইলিশের নিরাপদ প্রজননের লক্ষ্যে এই ২২দিন নদ-নদীতে ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে। এই সময় মাছের ঘাট, মৎস্য আড়ৎ, হাট-বাজার, চেইনশপে ব্যাপক অভিযান চালানো (নিষিদ্ধ সময়ে) হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, নৌ পুলিশ, ‌র‌্যাব, বিজিবি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং মৎস্য অধিদফতর এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করবে। ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময়ে জেলেদের ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) দিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা সংশ্লিষ্ট জেলা উপজেলায় গিয়ে পৌঁছেছে। ’

খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম জানান, অন্য বছরের মতো এ বছরও জেলেদের জন্য সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা বহাল রয়েছে। এ বছর ২২দিনের জন্য ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মৎস্য মন্ত্রণালয়। তাই এই ২২ দিনই তারা খাদ্য সহায়তা পাবেন। এ জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সংশ্লিষ্ট জেলায় পৌঁছেছে। যেখানে এখনও পৌঁছায়নি, সেখানেও পৌঁছে যাবে।’

ক্রেতাদের করণীয়

এই ২২দিনে হাঁট, বাজার, আড়ৎ , চেইনশপ বা কোথাও থেকে কেউ ইলিশ কিনতে পারবেন না। এ সময় ইলিশ বেচলে বা কিনলে, তা আইনের চোখে অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ সময় ক্রেতারা ইলিশ সংরক্ষণও করতে পারবেন না। এমনকি খাবার হোটেলগুলোতেও ইলিশের তরকারি বা মাছ বিক্রি করা যাবে না। বিষয়গুলো তদারকির দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। যদি কোনও ক্রেতা সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ২২দিনের যে কোনও সময় ইলিশ ক্রয় বা মজুদ করেন বা মজুদ অবস্থায় পাওয়া যায়, তাহলে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল বা এক লাখ টাকা জরিমানা করতে পারবেন।

আড়তদারের করণীয়

নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ইলিশের সব আড়ৎ বন্ধ থাকবে। আড়তগুলোতে ইলিশ কেনাবেচা বা মজুদ করা বা রাখা যাবে না। কোনও আড়তদার এই সময় ইলিশ কেনাবেচা বা মজুদ করলে, তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে আড়তগুলোতে পুলিশ, র‌্যাবের যৌথ অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারবে। এ সময় যদি কোনও আড়তে ইলিশ কেনাবেচা বা মজুদ অবস্থায় পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে আড়তে পাওয়া ইলিশ জব্দ এবং সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার দায়ে আড়তদার বিদ্যমান আইনে ছয় মাসের জেল এবং এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর করণীয়

মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন এই ২২দিন তৎপর থাকতে হবে স্থানীয় উপজেলা ও জেলা প্রশাসনসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে। জেলা বা উপজেলায় কর্মরত সংশ্লিষ্ট মৎস্য কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। এই সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসক সমগ্র জেলার জেলেদের তালিকা তৈরি করবেন। যা নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার তারিখের আগেই চূড়ান্ত করেছেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সহায়তা নেবেন। এর পর তালিকাভূক্ত জেলেদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া খাদ্য সহায়তা (চাল বা গম) দেবেন। এ সময় একজন জেলের পরিবার সর্বোচ্চ ৩০ কেজি চাল পাবেন। খাদ্য সহায়তা বাবদ চালের পাশাপাশি বা বিকল্প হিসেবে গম দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও এখন সর্বক্ষেত্রেই চাল সহায়তা দেওয়া হয়। জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি ব্যবস্থাপনা করবেন স্থানীয় চেয়ারম্যান। এ কার্যক্রমটি তদারকি করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসক। তাদের সহায়তা করবেন স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তা।

এই সময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীতে টহল দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। নদনদীতে যাতে কোনও জেলে জাল না ফেলে বা ইলিশ ধরার কাজের সঙ্গে যেন কেউ যুক্ত না থাকেন, তা নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, নৌ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে সরকারের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করবেন। এ সময় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। আইন বা সরকারি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীর বিরুদ্ধে জেল জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারবেন।

জেলেদের করণীয়

ইলিশ না ধরার নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ২২দিন একজন জেলে কোনোভাবেই নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারবেন না। তিনি যদি সরকারি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ ধরতে যান, তাহলে তিনি যেকোনও সময় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মুখোমখি হবেন। ধরা পড়লে তিনি জেল বা জরিমানা এমনকি উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

একজন জেলেকে সব সময় মনে রাখতে হবে, প্রতিবছরই পেশাজীবী জেলেদের তালিকা তৈরি করেন ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তা। ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিবছর করা জেলেদের তালিকা সংযোজন বিয়োজনও করেন। তাই প্রতিবছরই একজন জেলের উচিৎ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে নিজের নাম মৎস্য অফিসে বা ইউনয়ন পরিষদে সংরক্ষিত জেলে তালিকায় আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলাকালীনএকজন তালিকাভুক্ত জেলে কবে এবং কোথা থেকে সরকারের খাদ্য সহায়তা পাবেন বা নেবেন, তা নিশ্চিত হয়ে সেখানে গিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি খাদ্য সহায়তা নিয়ে আসবেন। যদি এ ক্ষেত্রে কোনও জেলে দেখতে পান যে, স্থানীয় জেলে তালিকায় নিজের নাম নাই, সেক্ষেত্রে দ্রুত বিষয়টি ইউপি চেয়ারম্যান, স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তা, এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা এবং নিজের নামটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। জেলেকে মনে রাখতে হবে, তিনি যদি তালিকাভুক্ত জেলে না হন, তাহলে তিনি সরকারি খাদ্য সহায়তা পাবেন না।

Please follow and like us:
0

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

SuperWebTricks Loading...