প্রবীণদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত নয় দেশ

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস, জাকিয়া আহমেদ ॥ সরকার দেশের প্রবীণ নাগরিকদের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রবীণরা সেসব অধিকার পাচ্ছেন না। পরিবার ও সমাজ প্রবীণদের বিষয়ে সচেতন নয়,তাদের বিষয়ে উদ্যোগী নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবীণদের সংখ্যা বাড়লে তাদের নিয়ে যে চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে তা মোকাবিলায় প্রস্তুত নয় দেশ।

জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী, কারও বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হলে তাকে প্রবীণ বলে অভিহিত করা হয়। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ প্রবীণদের সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

প্রবীণদের তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০-৭০ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধদের তরুণ প্রবীণ, ৭০-৮০ মধ্য প্রবীণ এবং ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে যারা রয়েছেন তাদের বলা হয় অতিপ্রবীণ। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অতিপ্রবীণের হার অনেক দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। ২০৫০ সালে দেশে প্রতি পাঁচজনে একজন মানুষ হবেন প্রবীণ। ২০১৩ সালে প্রবীণদের জন্য মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন হয়েছে ‘প্রবীণ নীতিমালা’ আর সংসদে অনুমোদন হয়েছে পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে বার্ধক্য এখন এক বড় সমস্যা। কারণ বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার আট ভাগ প্রবীণ। সে হিসাবে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠার সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ। ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা হবে প্রায় দুই কোটি এবং ২০৫০ সালে হবে প্রায় সাড়ে চার কোটি। ২০৬১ সাল নাগাদ এ সংখ্যা হবে সাড়ে পাঁচ কোটি।

২০৫০ সালে শিশুদের চেয়ে প্রবীণদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। জনসংখ্যার হিসাবে শিশু হবে ১৮ ভাগ আর প্রবীণ ২১ ভাগ। তখন নানামুখী চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে।

শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় প্রতিটি কক্ষেই একজন করে থাকছেন। তাদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, গত ৯ বছর ধরে তিনি এখানে থাকছেন। এ শহরে তার ছেলে-মেয়ে রয়েছে। মেয়ে মাঝে মাঝেই পাশের বাংলাদেশ বেতারে আসেন কাজের জন্য, তখন তাকে দেখে যান। বাবার রেখে যাওয়া একটি বাড়ি ডেভেলপারকে দিয়ে দিয়েছেন একমাত্র ভাই। বাবা মারা যাওয়ার আগে মৌখিকভাবে তাকে বাড়িটির দ্বিতীয় তলা দিয়ে গেলেও কোনও দলিল না থাকায় ভাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। ভাই এবং ছেলে-মেয়ের সংসারে ঠাঁই না হওয়ায় তিনি আশ্রয় নিয়েছেন প্রবীণ হিতৈষী সংঘের পাঁচতলার একটি কক্ষে।

তিনি আরও বলেন,‘খুব বেশি দিন তো আর বাঁচবো না। এদের বলে দিয়েছি, মারা যাওয়ার পর যেন লাশটা আঞ্জুমান মফিদুলে দিয়ে দেয়। জীবিত থাকতে যারা আমাকে নিতে পারলো না, মরে যাওয়ার পরও যেন তারা কেউ আমাকে না নেন।’

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক এ এস এম আতীকুর রহমান বলেন, ‘আগে স্বামী-স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে পরিবার ধরা হলেও এখন পরিবার করা হয়েছে পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী এবং দুই সন্তানসহ ৬ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রবীণদের সেবা দেওয়ার জন্য সরকার প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন নামে একটি আইন করতে যাচ্ছে। এটি একেবারেই চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই সেটি পাস হয়ে যাবে।’

প্রবীণদের জন্য একটি নিবাস প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এক কোটি ৪০ লাখ প্রবীণের জন্য হাতেগোনা চার-পাঁচটি নিবাস রয়েছে। যেখানে এক থেকে দেড় হাজার প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু যারা একেবারেই একা তাদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৫ লাখ প্রবীণ অবসরকালীন ভাতা পান। ৩৫ লাখ প্রবীণ পান বয়স্ক ভাতা। আরও কিছু প্রবীণ সংসারে বা পরিবারে থাকলেও বেশ বড় একটা অংশ কেবলমাত্র ভিক্ষাবৃত্তি করে বেঁচে থাকেন। এখন আমাদের প্রয়োজন,সরকারিভাবে জরিপ করে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা।’

বয়স্ক ভাতার পরিবর্তে যদি বয়স্ক বীমা বা সার্বজনীন নাগরিক পেনশন চালু করা যায়,তাহলে সেটি বেশি ফলপ্রসূ হবে জানিয়ে তিনি বলেন,‘প্রবীণদের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, কারণ দেশ এখনও প্রস্তুত নয় প্রবীণদের নিয়ে।’

প্রবীণ নারী বেশিদিন বাঁচেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষভাবে এখানে প্রবীণ নারীদের বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশে প্রায় ৭৫ লাখ প্রবীণ নারী রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শেষ বয়সে নারীর মতো সামাজিক, শারীরিক, অর্থনৈতিকভাবে কেউ সাফার করে না, তাই তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এ এস এম আতীকুর রহমান বলেন, প্রতিবন্ধী, যৌনকর্মী, বৃহন্নলা কিংবা দলিত শ্রেণির যারা প্রবীণ রয়েছেন-এদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া খুবই জরুরি। প্রবীণদের বিষয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় একমাত্র কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্য মন্ত্রণালয়সহ সবারই কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আমি মনে করি একটি পৃথক মন্ত্রণালয়ই করা উচিত প্রবীণদের জন্য। কারণ প্রতিটি মানুষই প্রবীণ হবে, বার্ধক্যের হাত থেকে বাঁচার উপায় কারও নেই।

প্রবীণদের নিয়ে কাজ প্রবীণ বন্ধু সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ডা. মহসীন কবির লিমন বলেন, ‘প্রবীণদের নিরাপত্তাসহ অধিকার নিয়ে আমরা স্বোচ্চার নই। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে প্রবীণরা নানা দুর্ভোগে পড়বেন। আর এ দুর্ভোগ মোকাবিলায় কাজ শুরু করার প্রয়োজন এখনই। তরুণদের এ নিয়ে কাজ করতে হবে।’

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

SuperWebTricks Loading...