বিশেষ প্রতিবেদন

গ্রেপ্তার এড়াতে অমিতের কৌশলে বিস্মিত পুলিশ

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস ॥ শুধু সন্দেহের বশে খুনের পর যে যুবক বন্ধুর লাশ চার দিন ধরে নিজের ঘরে রেখে দিতে পারেন, তাঁকে ধরা পুলিশের জন্য খুব সহজ কাজ ছিল না। এ ছাড়া তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে। নিজেকে যুবলীগের ‘নেতা’ পরিচয় দেওয়া এই যুবকের নাম অমিত মুহুরী। যুবলীগের কেন্দ্রীয় এক নেতার অনুসারী তিনি। এর বাইরে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের তালিকার ওপরের দিকেই তাঁর নাম রয়েছে।

বন্ধুকে খুনের পর লাশ ড্রামে ভরে অ্যাসিড ঢেলে দিঘিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাটি গত ৩১ আগস্ট জানাজানি হওয়ার পর অমিতকে ধরতে পুলিশ অভিযান শুরু করে। আর অমিত কৌশল নেন পুলিশকে বোকা বানানোর। তাঁর নেওয়া কৌশল বিস্মিত করেছে পুলিশকে। হিন্দি ও ইংরেজি সিনেমা দেখে এবং কয়েকজন ‘গুরু’র পরামর্শে পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল তিনি রপ্ত করেন বলে জানান চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি অঞ্চল) জাহাঙ্গীর আলম। তবে ওই গুরু কারা তা এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেননি।

অমিতকে যখন পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন এক বন্ধুকে নিজের মুঠোফোনটি দিয়ে চলে যেতে বলেন যশোরের বেনাপোলে। বলে দেন মুঠোফোনটি কয়েক দিন সচল রাখতে। মুঠোফোনে নজরদারি করে পুলিশ যাতে বুঝতে পারে অমিত ভারতে পালিয়ে গেছেন। এই কৌশলে কাজও হয়। মুঠোফোনে তাঁর অবস্থান বেনাপোলে শনাক্ত করে পুলিশ। অথচ তিনি তখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও কুমিল্লা ঘুরে আসেন। চুল, দাড়ি কেটে নিজের বেশভূষাতেও পরিবর্তন আনেন, যাতে পরিচিত লোকজনও তাঁকে প্রথম দেখাতেই চিনতে না পারেন। এ ছাড়া কৌশল হিসেবে কিছুদিনের জন্য ভর্তি হন কুমিল্লার একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে।

শুধু তা-ই নয়, চট্টগ্রামে অমিতের অনুসারীরা প্রচার করতে থাকেন তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন। এই কৌশল নেওয়ার কারণ, ভারতে চলে যাওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে অমিতকে খুঁজে বের করার চেষ্টা থেমে যাবে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর সব কৌশল ভেস্তে গেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২ সেপ্টেম্বর তাঁকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার এড়ানোর এসব কৌশল পুলিশকে বলেন অমিত।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অপরাধ করে কীভাবে আলামত গায়েব করতে হয়, গ্রেপ্তার এড়াতে কীভাবে পুলিশকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব সব কৌশলই জানা রয়েছে সন্ত্রাসী অমিতের। অপরাধের পরই আলামত নষ্ট করে ফেলা এবং পুলিশি ধরাছোঁয়ার বাইরে নিজেকে রাখার ক্ষেত্রে অভিনব কৌশল খাটাতেন অমিত। কথায় কথায় ছুরি মারা ও গুলি করা এই যুবকের অভ্যাসে পরিণত হলেও সব সময় খুবই স্বাভাবিক থাকেন। এমনকি রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদেও তিনি স্বাভাবিক ছিলেন। অপরাধ নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই।

পুলিশের সহকারী কমিশনার বলেন, মুঠোফোনে ট্র্যাকিংয়ের (অবস্থান শনাক্ত করার প্রযুক্তি) মাধ্যমে এখন বেশির ভাগ অপরাধীর অবস্থান জানতে পারে পুলিশ। অমিতের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্ত করা হয় যশোরের বেনাপোল। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর এক বন্ধুও অমিত ভারত যেতে বেনাপোলে গেছেন বলে পুলিশকে তথ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে তাঁরা নিশ্চিত হন অমিতের মুঠোফোন বেনাপোলে থাকলেও তিনি সেখানে যাননি। পরে তাঁকে গ্রেপ্তারে অন্য কোশল নেন তাঁরা। এতে দ্রুত কাজ হয়।

পুলিশ জানায়, অমিতের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির ১৪টি মামলা রয়েছে। পূর্বাঞ্চল রেলের কোটি টাকার দরপত্র নিয়ে জোড়া খুনের মামলার আসামিও তিনি। ২০১৩ সালের ২৪ জুন চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকায় ওই দরপত্র নিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক শিশুসহ দুজন নিহত হয়। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-অর্থবিষয়ক সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী ওরফে বাবরের অনুসারী অমিত। জোড়া খুনের মামলায় বাবরও আসামি। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার অমিতকে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াছিন আরাফাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখান আদালত। চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ক্লাস শেষে নন্দনকানন এলাকার বাসায় ফেরার পথে আমতল এলাকায় ছুরিকাঘাতে খুন হন ইয়াছিন। এর আগেও কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন অমিত। তবে জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।

তবে সর্বশেষ অমিত আলোচনায় আসেন বন্ধুকে হত্যার ঘটনায়। গত ১৩ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের এনায়েতবাজার এলাকার রানীরদীঘি থেকে একটি ড্রাম উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে বোমা রয়েছে ভাবা হলেও ড্রাম কেটে ভেতরে লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ গলে যাওয়ায় তখন পরিচয় বের করা যায়নি। এ ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ৩১ আগস্ট ইমাম হোসেন ও শফিকুর রহমান নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা পুলিশকে বলেন, ড্রামের ভেতরে পাওয়া লাশটি অমিতের বন্ধু নগর যুবলীগের কর্মী ইমরানুল করিমের। ৯ আগস্ট নগরের নন্দনকানন হরিশ দত্ত লেনের নিজের বাসায় ইমরানুলকে ডেকে নেন অমিত। এরপর বাসার ভেতরেই তাঁকে হত্যা করা হয়।

অমিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, নিজের বাল্যবন্ধুকে খুন করে আলামত না রাখার জন্য প্রথমে লাশ টুকরো টুকরো করার চেষ্টা করা হয়। পরে ড্রামে অ্যাসিড ও চুন দিয়ে লাশের নিশানা মুছার চেষ্টা হয়। যাতে শুধু হাড় থাকে। ড্রামে ভরে মুখটি সিমেন্ট-বালু দিয়ে ঢালাই করা হয়। তাঁরা বলেন, অমিত নিশ্চিত ছিলেন ড্রামটির খোঁজ মিলবে না। আর খোঁজ মিললেও লাশের পরিচয় পাওয়া যাবে না। তবে অপরাধ কখনোই আড়াল করা যায় না।

Comment here