‘জিনের বাদশা’র কাছ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস ॥ ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ‘জিনের বাদশা’ পরিচয়ধারী দুই ব্যক্তির কাছ থেকে গত রোববার সাড়ে ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁরা দুটি মামলার প্রধান আসামি। বাড়ি উপজেলার ফুলকাচিয়া গ্রামে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রামটির একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে জিনের বাদশা পরিচয়ে নানা প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। এভাবে চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এর মধ্যে প্রতারণার শিকার দুই নারী বোরহানউদ্দিন থানায় দুটি মামলা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এসব মামলায় ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের সবার বাড়ি উপজেলার ফুলকাচিয়া গ্রামে। উদ্ধার করা টাকা দুই বাদীকে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

একটি মামলার বাদী রওশনারা বেগম গত রোববার বিকেলে বলেন, তাঁর বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজলিশপুর গ্রামে। তাঁর স্বামী মো. জাহাঙ্গীর আলম সৌদিপ্রবাসী। চক্রটি জিনের বাদশা পরিচয়ে ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। চক্রের সদস্যরা ঢাকার সাভারে ৫১ শতাংশের একটি প্লট কিনে দেওয়ার নাম করে দুই দফায় তাঁদের কাছ থেকে ৫৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। পরে প্লট বুঝিয়ে দিতে বললে প্রতারক ব্যক্তিদের একজন ভয় দেখিয়ে বলেন, ‘আমি জিনের বাদশা। বেয়াদবি করলে তোর ছেলেমেয়েরা মুখে রক্ত উঠে মারা যাবে। তোর ছেলেকে বাঁচাতে পারবি না। ধ্বংস হয়ে যাবি।’ এর মধ্যে তাঁর ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁরা ভীত হয়ে পড়েন। এই সুযোগে চক্রটি আরও দুই ধাপে ৩৭ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ২১ জুন রওশনারা বেগম বাদী হয়ে বোরহানউদ্দিন থানায় মামলা করেন। এতে ফুলকাচিয়া গ্রামের মো. রিয়াজকে প্রধান আসামি করে ২১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ জনকে আসামি করা হয়। পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলাটির তদন্ত করছেন একই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, রিয়াজকে গত ২৯ জুন গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন।

রওশনারা আরও বলেন, মামলা করায় আসামিদের পরিবারের সদস্যরা এসপির মাধ্যমে গত রোববার তাঁকে ৩ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন।

আরেকটি মামলার বাদী নাজিয়া ইসলাম ওরফে পারুল বিবি। গত ৫ মার্চ করা ওই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মো. জুয়েলকে। এ মামলায় মোট ৫১ জনকে আসামি করা হয়েছে। সবার বাড়ি ফুলকাচিয়া গ্রামে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, নাজিয়ার বাড়ি ঢাকার গুলশানে। আসামিরা জিনের বাদশা পরিচয়ে গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা বোরহানউদ্দিন থানার এসআই মো. রাসেল বলেন, প্রধান আসামি জুয়েল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একই ধরনের এক প্রতারণার মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

দুটি মামলা ও প্রতারক চক্রটির বিষয়ে নজর রাখছেন জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম (লালমোহন সার্কেল)। রফিকুল ইসলাম ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ফুলকাচিয়া গ্রামের আবদুল গণি মিয়া নামের এক ব্যক্তি প্রায় ২০ বছর আগে জিনের বাদশা পরিচয়ে প্রতারণার এ ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে গ্রামটির ৭০ শতাংশ লোক জিনের বাদশা সেজে প্রতারণা করে আসছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ চক্রের সদস্য রয়েছেন। তাঁরা রোগবালাইসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কথা বলে দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকা ও টিভিতে বিজ্ঞাপন দেন। পরে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেন।

পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশি তদন্তে ইতিমধ্যে বেরিয়ে এসেছে, মোবাইল ব্যাংকিং, মানি ট্রান্সফার ও ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতারক চক্রটি কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেয়। বেশির ভাগ টাকা আসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। ওই গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের বাসিন্দাদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। গ্রামটির একজন বাসিন্দার ব্যাংক হিসাব থেকে ৮ মাসে ১৯ লাখ টাকা তোলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ টাকা দেশের বাইরে থেকে এসেছে।

ভোলার পুলিশ সুপার মোকতার হোসেন বলেন, দুটি মামলার প্রধান দুই আসামির পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। তা থেকে পারুল বিবিকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা এবং রওশনারা বেগমকে ৩ লাখ টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

Please follow and like us:
0

You May Also Like

One thought on “‘জিনের বাদশা’র কাছ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

SuperWebTricks Loading...