গুলশান হামলায় জড়িত ২১ জঙ্গি শনাক্ত

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস॥ গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে (রেস্তোরাঁ) হামলার মূল সমন্বয়ক, আক্রমণকারী জঙ্গিদের প্রশিক্ষক, পরিকল্পনাকারী, বোমা তৈরি, অস্ত্র সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত এমন ২১ জনকে শনাক্ত করেছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম বিভাগ। তাঁদের মধ্যে ১০ জন পলাতক রয়েছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পলাতকদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তাঁরা হলেন নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান, রাজীব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীর, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট, সোহেল মাহফুজ, সাগর, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ, ওয়াসিম আজওয়াত বিন আবদুল্লাহ ওরফে মানিক, ইকবাল ও জুনায়েদ খান। এঁরা সবাই ‘নব্য জেএমবি’র সদস্য।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, পলাতক আসামিদের মধ্যে খালেদ ও রিপন ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। মারজান, রাজীব গান্ধী, বাশারুজ্জামানকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা যাবে বলে কর্মকর্তারা আশাবাদী।

শনাক্ত হওয়া আসমিদের মধ্যে ১১ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গুলশানে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গিও রয়েছেন। তাঁরা হলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, স্কলাসটিকার ছাত্র মীর সামেহ মোবাশ্বের, মোনাশ ইউনিভার্সিটির মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসের ছাত্র নিবরাস ইসলাম এবং বগুড়ার শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কাউন্টার টেররিজমের কর্মকর্তারা বলছেন, গুলশানে হামলার মূল সমন্বয়ক ও পরিকল্পনাকারী হলেন তামিম চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে যুক্ত ছিলেন নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান। যোগাযোগ সমন্বয়ক ছিলেন তাওসিফ হোসেন। তামিম ও তাওসিফ গত ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অভিযানে নিহত হন। ২৬ জুলাই ঢাকার কল্যাণপুরে অভিযানে নিহত রায়হান ইবনে কবির ও ২ সেপ্টেম্বর রূপনগরে নিহত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ জঙ্গিদের গাইবান্ধার চরে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গুলশানে হামলাকারীদের জন্য বাসা ভাড়া করার কাজে যুক্ত ছিলেন তানভীর কাদেরী ও ফরিদুল ইসলাম ওরফে আকাশ। তানভীর গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে আজিমপুরে পুলিশের অভিযানে নিহত হন। সর্বশেষ গত শনিবার গাজীপুরে অভিযানে নিহত হন ফরিদুল ইসলাম ওরফে আকাশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, গুলশানে হামলার জন্য অস্ত্র সংগ্রহে যুক্ত ছিলেন সাগর ও আবু নাঈম হাকিম। বোমা তৈরিতে যুক্ত ছিলেন সোহেল মাহফুজ। হলি আর্টিজানে হামলার পর ভেতর থেকে জঙ্গিরা নৃশংসতার ছবি তুলে পাঠান মারজানের কাছে। মারজান সেগুলো পাঠান তামিম চৌধুরীর কাছে। পরে তামিম ওই সব ছবি আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজে পাঠান, যা ওই রাতে ইন্টারনেটে প্রচার পায়। গাইবান্ধার রাজীব গান্ধী বসুন্ধরার ভাড়া করা বাসায় সপরিবারে থেকে আক্রমণকারী জঙ্গিদের উদ্বুদ্ধ করেন।

পুলিশ বলছে, গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে দুই দফায় হুন্ডির মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা আসে। এই টাকা গ্রহণ করেন বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট। আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে বাশারুজ্জামানের স্ত্রী আটক হন। বাশারুজ্জমানকেও শিগগির গ্রেপ্তার করা যাবে বলে পুলিশ আশাবাদী।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশানে জঙ্গি হামলা মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতাসহ অনেককেই শনাক্ত করা হয়েছে।

গত ১ জুলাই রাতে জঙ্গিরা গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে হত্যা করেন। তাৎক্ষণিক অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন পুলিশের দুজন কর্মকর্তা। পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের জিম্মি উদ্ধার অভিযানে হামলায় জড়িত পাঁচ জঙ্গি এবং ওই রেস্তোরাঁর এক পাচক সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হন। রেস্তোরাঁর আটক আরেক কর্মী জাকির হোসেন ওরফে শাওন পরে হাসপাতালে মারা যান।

মামলার অগ্রগতি জানাতে গিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, হলি আর্টিজানের কর্মী সাইফুল ইসলাম চৌকিদার ও জাকির হোসেনের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি।

গুলশানে হামলার ঘটনায় করা মামলায় এখন দুজন গ্রেপ্তার আছেন। তাঁরা হলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক খণ্ডকালীন শিক্ষক হাসনাত রেজা করিম ও কল্যাণপুরের অভিযানে আহত অবস্থায় ধরা পড়া রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান। এ ছাড়া এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে উদ্ধার হওয়া ১৪ জন জিম্মি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

Please follow and like us:
0

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

SuperWebTricks Loading...