বাংলাদেশে কথিত আবু ইব্রাহিম সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস॥ সিরিয়া-ইরাকভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নতুন সাময়িকী রুমাইয়াহতে বাংলাদেশে আরও হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বহুভাষিক এই সাময়িকীতে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অভিযানে নিহত জঙ্গিনেতা তামিম চৌধুরীর একটি নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার বিবরণ এবং ওই হামলায় নিহত পাঁচ জঙ্গির ছবি দিয়ে তাদের শহীদ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, এটাই শেষ হামলা নয়, আরও হামলা হবে। এই নিবন্ধে সম্ভাব্য হামলার কয়েকটি লক্ষ্যের কথাও বলা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রুমাইয়াহর নিবন্ধ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে তামিম চৌধুরী আর আইএসের দাবি অনুযায়ী তাদের বাংলাদেশের কথিত প্রধান শেখ আবু ইব্রাহিম আল-হানিফ এক ব্যক্তি নন।

এর আগে গত এপ্রিলে আইএসের আরেক সাময়িকী দাবিক-এ বাংলাদেশে তাদের প্রধান হিসেবে আবু ইব্রাহিম আল-হানিফের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। এরপর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর বের হয়েছিল যে তামিম চৌধুরীই কথিত আবু ইব্রাহিম আল-হানিফ। কিন্তু এখন আইএসের সাময়িকীতে তামিম চৌধুরীর ‘কুনিয়া’ বা জিহাদি ছদ্মনামটি ব্যবহার করা হয়েছে। তা হলো আবু দুজানা আল-বাঙালি। আর তাঁকে বলা হচ্ছে তাদের বাংলাদেশে কথিত সামরিক শাখার সাবেক প্রধান।

এ প্রসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওই কর্মকর্তা বলেন, সাবেক প্রধান উল্লেখ করে প্রকারান্তরে আইএস তামিমের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এখন কথিত আবু ইব্রাহিম আল-হানিফের প্রকৃত নাম ও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ দেশে আইএসের সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, যারা নিজেদের আইএস দাবি করছে, তারা দেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি।

এ বিষয়ে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা সতর্ক আছি। ইতিমধ্যে পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে জঙ্গিদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শক্তি ক্ষয় হয়েছে। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অব্যাহত চেষ্টা করে যাচ্ছি, যাতে তারা আর দাঁড়াতে না পারে।’

আটটি ভাষায় প্রকাশিত আইএসের নতুন এই সাময়িকীর দ্বিতীয় সংখ্যা অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। জঙ্গিদের অনলাইন তৎপরতার দিকে নজর রাখা সাইট ইন্টেলিজেন্ট গ্রুপের প্রধান রিটা কার্টজ রুমাইয়াহতে প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক নিবন্ধটি সম্পর্কে এক টুইটার বার্তায় বলেছেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক তামিম চৌধুরীকে আইএস তাদের বাংলার সামরিক শাখার সাবেক প্রধান হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তামিমের লেখা নিবন্ধে বলা হয়, ‘আইএস নিরাপত্তার ফাঁকফোকর খুঁজে বের করবে এবং বিদেশি নাগরিক, পর্যটক, কূটনীতিক, পোশাক ক্রেতা ও ধর্মপ্রচারকের ওপর হামলা চালাবে।’

আইএসের সাময়িকীতে তামিম চৌধুরীকে ‘বাংলার খিলাফতের সৈনিকদের সামরিক ও গুপ্ত হামলার সাবেক প্রধান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিবন্ধে তাঁর সাংগঠনিক নাম আবু দুজানাহ আল-বেঙ্গলি এবং ব্র্যাকেটে তাঁর প্রকৃত নাম তামিম চৌধুরীও লেখা হয়েছে।

আইএস তাদের সদস্যদের ‘খিলাফতের সৈনিক’ বলে সম্বোধন করে। গুলশান হামলায় জড়িত ও পরে অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গিকে তারা একই সম্বোধন করে এবং হামলার দায় স্বীকার করে। যদিও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, গুলশান হামলায় আইএস নয়, নব্য জেএমবি জড়িত। তামিম চৌধুরী এই নব্য জেএমবির নেতা এবং ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার অন্যতম সমন্বয়ক ও পরিকল্পনাকারী। গত ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে জঙ্গিবিরোধী পুলিশের এক অভিযানে তামিম ও তাঁর দুই সহযোগী নিহত হন।

প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর তাঁর নামে প্রকাশিত এই নিবন্ধে হামলার স্থান হিসেবে গুলশানের হলি আর্টিজানকে বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়। হত্যার জন্য জিম্মিদের আলাদা করার কথার উল্লেখ আছে। এতে দাবি করা হয়, যাঁরা নিজেদের মুসলমান প্রমাণ করতে পেরেছেন, তাঁদের প্রতি ভালো ব্যবহার করা হয়েছে। নিবন্ধে পাঁচ হামলাকারীর বিস্তারিত পরিচয়ও দেওয়া হয়েছে।

তামিমের এই নিবন্ধের বিষয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার অনলাইন সংস্করণেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, রুমাইয়াহতে তামিমের নামে প্রকাশিত নিবন্ধের বিষয়টি তাঁরা যাচাই-বাছাই করছেন।

তবে বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রুমাইয়াহতে প্রকাশিত লেখাটি যে তামিমের, এ ব্যাপারে তাঁরা মোটামুটি নিশ্চিত। এটা গুলশানে হামলার পরে ও তামিমের মৃত্যুর আগে লেখা। নারায়ণগঞ্জে তাঁর আস্তানায় অভিযানের সময় এর আলামত পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তার মতে, আইএস মতাদর্শ অনুসরণকারী এদেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি এখন ব্যাপকভাবে চাপের মুখে আছে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ অনেকে পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছেন, অনেকে ধরা পড়েছেন। এ অবস্থায় হতাশ কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখতে এ ধরনের লেখা প্রচার করছে।

আইএসের সাময়িকীতে এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেটের বিভিন্ন জঙ্গি হামলা নিয়ে ‘অপারেশনস ইন বেঙ্গল’ শীর্ষক একটি ইনফোগ্রাফিক প্রকাশ করা হয়৷ তাতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেলা থেকে এ পর্যন্ত ২৪ হামলার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এতে গত ঈদুল ফিতরে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলার কথা উল্লেখ করা হয়নি। ইনফোগ্রাফিকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে আইএসের হামলায় যাঁরা আক্রান্ত ও নিহত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে ৪২% হিন্দু ও বৌদ্ধ, ২৭% খ্রিষ্টান, ১৯% মুরতাদ ও নাস্তিক এবং ১২% শিয়া রয়েছে।

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment