সাবেক এমডির অপকীর্তিই ডুবিয়েছে বিডিবিএল

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস, হাছান আদনানঃ যাচাই-বাছাই না করেই অযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের ঋণ দেয়া হয়েছে। ঋণের বিপরীতে রাখা হয়নি পর্যাপ্ত জামানত। যাওবা জামানত রাখা হয়েছে, অস্তিত্ব মিলছে না তারও। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) থেকে এসব ঋণ দিয়েছেন ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মো. জিল্লুর রহমান, যা এখন খেলাপি হয়ে গেছে। সাবেক এমডির এসব অপকীর্তিই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটিকে ডুবিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যাত্রার এক মাস পর বিডিবিএলের এমডির দায়িত্ব পান ড. জিল্লুর রহমান। দায়িত্ব নেয়ার সময় ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ ছিল বিতরণ করা ঋণের ৩১ শতাংশ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ড. জিল্লুর রহমানের বিদায় নেয়ার সময় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ৪৯ শতাংশ। নিয়মবহির্ভূতভাবে কমিশনের বিনিময়ে ভূঁইফোড় কিছু প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার কারণেই ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

যদিও এ অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি ড. জিল্লুর রহমানের। তিনি বলেন, অনেক পুরনো ঋণ আমি উদ্ধার করেছি, সেগুলোর কথা তো কেউ বলছে না। দায়িত্ব পালনকালে দশটি কাজ করতে গিয়ে হয়তো তিনটি খারাপ হয়েছে। কিন্তু এখন যদি বলা হয় কেন তিনটি খারাপ হলো, তা তো হবে না।

বিডিবিএল থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০১২ সালের ২৩ মে এমএম ভেজিটেবল অয়েল প্রডাক্টস লিমিটেডকে ১৩৬ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করে বিডিবিএল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ৭৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর পুরোটাই মন্দঋণে পরিণত হয়েছে। একই বছরের ২১ মে ঢাকা ট্রেডিং হাউজের নামে ৫৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে ব্যাংকটি। এর মধ্যে ৪২ কোটি ৭ লাখ টাকাই মন্দঋণে পরিণত হয়েছে।

২০১৪ সালের ২৫ মার্চ নর্থ বেঙ্গল এগ্রো কনসার্নকে ২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ঋণ দেয় বিডিবিএল। ঋণ বিতরণের পর এক টাকাও ফেরত পায়নি ব্যাংকটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিডিবিএলের পাওনা ২৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এ টাকার পুরোটাই মন্দমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর টাটকা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ২০ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকটি। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে এক টাকাও উদ্ধার করতে পারেনি বিডিবিএল। সুদসহ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

এছাড়া টিআর স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৪৮ লাখ, নর্থ বেঙ্গল পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের কাছে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ, বগুড়া মাল্টিপারপাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কাছে ৯ কোটি ৮৫ লাখ, স্টার ৫০ ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক লিমিটেডের কাছে ৫ কোটি ৭৪ লাখ, নির্মাণ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডেভেলপারস লিমিটেডের কাছে ৩ কোটি, নকশা ফার্নিচারের কাছে ৬ কোটি, ক্রিসেন্ট রাইস মিলসের কাছে ৪ কোটি ৫৬ লাখ, হাজি তারা মিয়া পোলট্রি ফার্মের কাছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ও মাহসালিম ইস্পাত লিমিটেডের কাছে পাওনা ৪ কোটি টাকা। এসব ঋণেরও অধিকাংশ মন্দমানে খেলাপি হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, দায়িত্ব পালনকালে ড. জিল্লুর রহমান কমিশনের বিনিময়ে কিছু প্রতিষ্ঠানকে মোটা অংকের ঋণ দিয়েছেন। ওই ঋণ আদায় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ঋণের বিপরীতে যে সম্পদ জামানত হিসেবে রাখা হয়েছে, তারও কোনো অস্তিত্ব নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের পরই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি বিডিবিএলে। চলতি বছরের জুন শেষে বিডিবিএলের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৫৭ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। এ হিসাবে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৫০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

ড. জিল্লুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, দুটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে বিডিবিএল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণের বোঝা বিডিবিএলকে বহন করতে হয়েছে। আমি দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংকটির ১৭টি শাখার মধ্যে ১৩টিই লোকসানি ছিল। কিন্তু সেখান থেকে ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

বিডিবিএলের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১১ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৬৮ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে তা ১১২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এর পর ২০১৫ সালে ব্যাংকটির মুনাফায় ধস নামে। গত বছর ব্যাংকটির মুনাফা হয় মাত্র ৫১ কোটি টাকা।

মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে মুনাফা করতে পারছে না বিডিবিএল। আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসছে অন্যান্য উত্স থেকে। এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব ভবনের ভাড়া ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) শেয়ারহোল্ডার হিসেবে মুনাফা। আগে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) ও বাংলাদেশ শিল্পঋণ সংস্থার (বিএসআরএস) নামে থাকলেও বর্তমানে রাজউক এভিনিউয়ে প্রধান কার্যালয় এবং কারওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম ও খুলনায় বহুতলবিশিষ্ট চারটি নিজস্ব ভবন রয়েছে বিডিবিএলের। পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ঝিনাইদহ ও রাজশাহীতে প্রায় ২৭ বিঘা জমি রয়েছে ব্যাংকটির।

জানতে চাইলে বিডিবিএলের বর্তমান এমডি মঞ্জুর আহমেদ বলেন, যেসব কর্মকর্তা নিয়ে বিডিবিএল প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতা নেই। এসব কর্মকর্তার কারণে ব্যাংকিং কার্যক্রম যথাযথ প্রক্রিয়ায় চালানো যাচ্ছে না। বড় খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের চেষ্টা চলছে। খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারে মামলা-মোকদ্দমাই এখন আমাদের সম্বল। তবে কিছু গ্রাহককে ঋণ মওকুফ করার জন্য আমরা সুযোগ দেয়ার চিন্তাভাবনা করছি। খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে গ্রাহকদের বেরিয়ে আসার জন্যই এ সুযোগ দেয়া হবে।

বিডিবিএল একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও শিল্প পুঁজির জোগানদানকারী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। এর মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৪০০ কোটি টাকা।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় ২০১০ সালে ব্যাংকটির শাখা ছিল ১৭টি। পাঁচ বছরে তিনি বিডিবিএলের শাখা ৩৮টিতে উন্নীত করেছেন। কিন্তু শাখাগুলোর মধ্যে ২৫টিই লোকসানিতে পরিণত হয়েছে। অথচ ব্যাংকটির চলতি বছর লোকসানি শাখা তিনটিতে নামিয়ে আনার কথা ছিল।

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশে প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্পঋণ সংস্থা। স্বাধীন বাংলাদেশে শিল্পের দ্রুত বিকাশের পথ সহজ করতে এ দুটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা করে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান দুটি ২০০৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। ২০০৯ সালের ১৬ নভেম্বর দুই প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে গঠন করা হয় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড। ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে বিডিবিএল। প্রতিষ্ঠার পর মাত্র এক মাস ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন বিলুপ্ত বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের এমডি মো. মিজানুর রহমান। এর পর এমডির দায়িত্ব দেয়া হয় ড. মো. জিল্লুর রহমানকে।

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment