পুলিশের মধ্যে আলসার ও ডায়াবেটিস বাড়ছে

পুলিশ

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস, নিহাল হাসনাইনঃ যখন তখন পেশাগত দায়িত্ব পালনে ডাক পড়া, অতিরিক্ত ডিউটির চাপ ও অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস— পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিত্য সমস্যা। আর এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের স্বাস্থ্যে। রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত এ বাহিনীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আলসার, ডায়াবেটিস ও হূদরোগে আক্রান্তের হার।

কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের তথ্য বলছে, পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত সদস্যদের ১৯ শতাংশই পেপটিক আলসারে ভুগছেন। ডায়াবেটিসে ভুগছেন ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ পুলিশ সদস্য। আর হূদরোগে আক্রান্তের হার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

২০১৫ সালে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১১ জন পুলিশ সদস্য। এদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে হূদরোগে। দুজন করে মারা গেছেন কিডনি ও ক্যান্সারে এবং হাইপারটেনশনে একজন মারা গেছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সমন্বয়কারী ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ডা. এমদাদ জানান, অতিরিক্ত ডিউটি, অনিয়মিত খাদ্যগ্রহণ ও সময়মতো চিকিৎসা না নেয়ার কারণে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন পুলিশ সদস্যরা। তবে এর মধ্যে আলসার, ডায়াবেটিস ও হূদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।

তিনটি রোগে আক্রান্তের হার বেশি হলেও কমবেশি অন্যান্য রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশে কর্মরতরা। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের ২০১৪ ও ২০১৫ সালের তথ্যমতে, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ট্রমা অ্যান্ড ফ্র্যাকচারে নয়, গাইনিকোলজিক্যাল রোগে নয়, চর্মরোগে পাঁচ, কিডনিজনিত সমস্যায় পাঁচ, রেস্পিরেটরি ট্র্যাক ইনফেকশনে চার, লিভারের সমস্যায় তিন, পিএলআইডিতে ২ দশমিক ৫, দাঁতের সমস্যায় ২ দশমিক ৫, ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশনে দুই, টিউমার ও ক্যান্সারে ১ দশমিক ৫, চোখের সমস্যায় ১ দশমিক ৫, মানসিক সমস্যায় এক এবং অন্যান্য রোগে ২ দশমিক ৫ শতাংশ আক্রান্ত। ট্রাফিক পুলিশের ক্ষেত্রে অবশ্য রোগের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। এরা সাধারণত শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, কিডনির সমস্যা এবং কান ও চোখের সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন।

এসব রোগে আক্রান্তদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সময়মতো পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়া। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ হূদরোগে মারা গেলেও কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে নেই কার্ডিওলজির আধুনিক কোনো যন্ত্র।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সেবার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৫৪ সালে রাজারবাগে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাছাড়া প্রতিটি বিভাগে (রংপুর ও ময়মনসিংহ ছাড়া) একটি করে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট পুলিশ হাসপাতাল রয়েছে। ওইসব হাসপাতালে পুলিশ সদস্যরা বিনা খরচে স্বাস্থ্য সেবা পেয়ে থাকেন। তবে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের একাধিক চিকিত্সকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে তৈরি করা অর্গানোগ্রামে পুলিশ হাসপাতালগুলো পরিচালিত হচ্ছে। সে সময় পুলিশে লোকবল কম ছিল। পরবর্তী সময়ে পুলিশে লোকবল বৃদ্ধি হলেও সে তুলনায় হাসপাতালগুলোর চিকিত্সক বাড়ানো হয়নি। এমনকি আগের অর্গানোগ্রামের পদগুলোও এখনো পূরণ করা হয়নি। এসব সংকটের কারণে নানা সময়ে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পুলিশ হাসপাতালে চিকিত্সক ও নার্স নিয়ে এসে কাজ চালাতে হয়।

কেন্দ্রীয় পুলিশ লাইন হাসপাতালের এক চিকিত্সক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রোগের ব্যাপকতা বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় আমাদের রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি বা লোকবল বৃদ্ধি করা হয়নি। এমনকি অর্গানোগ্রামে আমাদের যা যা পওয়ার কথা ছিল, তার ৩০ ভাগও দেয়া হয়নি। ফলে পুলিশ সদস্যরা রোগাক্রান্ত হলে অনেক সময়ই তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না।’

অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, পুলিশের স্বাস্থ্য সেবায় প্রধান বাধা লোকবল সংকট, যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন। সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় জঙ্গি দমন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। এসব হামলায় বেশির ভাগ পুলিশ সদস্য বোমার স্প্লিন্টার ও গুলিতে আহত হয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে এসব চিকিৎসার জন্য তেমন কোনো যন্ত্রপাতিও নেই। আর এ কারণেই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় আহত পুলিশ সদস্যরা চিকিৎসা নিচ্ছেন রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের জন্য রয়েছেন মাত্র একজন চিকিত্সক। যদিও শুধু রাজধানীতেই ডিউটি করে থাকেন ৩০ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য। এসব পুলিশ সদস্য অসুস্থ হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল অথবা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরো করুণ।

কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, আইসিইউ, সিসিইউ এমনকি কার্ডিওলজির মতো গুরুত্ব পূর্ণ যন্ত্রপাতিও নেই। এসব পরীক্ষার জন্য পুলিশকে বাধ্য হয়ে যেতে হয় বাইরের হাসপাতালে। কিন্তু সময়স্বল্পতা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার বিষয়টি বিবেচনা করে বেশির ভাগ পুলিশ সদস্যের পক্ষেই সেটি সম্ভব হয়ে ওঠে না।
পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, পুলিশের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ দেশে সব পুলিশ হাসপাতালেই শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজন। শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করলে প্রয়োজন হবে নতুন ভবন নির্মাণের। সবকিছু মিলিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া পুলিশের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় ।

পুলিশ হাসপাতালের নানা সংকট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘পুলিশ হাসপাতালের সংকটের বিষয়গুলো আমাদেরও নজরে এসেছে। সমস্যাগুলো সমাধানে নতুন করে অর্গানোগ্রাম তৈরি করা লাগবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি। আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

Please follow and like us:
0

Related posts

Leave a Comment