রোজায় ১৮ জেলায় পৌঁছায়নি টিসিবি’র পণ্য

ক্রাইম নিউজ সার্ভিস: রোজায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং স্বল্প আয়ের মানুষদের ন্যায্যমূল্যে খাদ্য পণ্য সরবরাহের ঘোষণা দিয়েই মাঠে নেমেছিল ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। মসুর ডাল, চিনি, তেল, খেজুর ও ছোলা এই পাঁচটি পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেছে কম আয়ের মানুষদের কাছে এসব পণ্য পৌঁছে দিতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে টিসিবি। দায়সারা গোছের কর্মসূচি চালিয়ে রোজার মাসের অর্ধেক পার হওয়ার আগেই দেশের বেশিরভাগ জেলায় স্থগিত কিংবা সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে এর কার্যক্রম।

মূলত রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোতে রোজা শুরুর এক সপ্তাহ আগে ২৯ মে এই কর্মসূচি শুরু হলেও বেশিরভাগ জেলায় এর কার্যক্রম ছিল নামমাত্র। ১৮টি জেলার মানুষ এ বছর রমজানে টিসিবি’র পণ্য চোখেই দেখেননি, টিসিবি ও ডিলারদের চাপান-উতোরের কারণে ৩০ টি জেলায় টিসিবি’র পণ্য বিক্রি হয়েছে অতি সামান্য পরিমাণে। গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের অতি দরিদ্র বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এই কর্মসূচির আওতাভুক্তই ছিলেন না। পণ্য বিক্রির বিষয়টিও নজরদারিতে ছিল না বেশিরভাগ জেলায়। এ কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণ দূরে থাকুক, সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর কানেই পৌঁছেনি টিসিবি’র পণ্য বিক্রির তথ্য। তবে রাজধানীসহ ১৩ টি জেলায় এ কার্যক্রম চলেছে মোটামুটিভাবে। এসব জেলায় নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে, একইসঙ্গে কিছু ডিলারের দোকানে সরকার নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করতেও দেখা গেছে। দেশের ৬১টি জেলা থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো উপাত্ত ও সংবাদের ভিত্তিতে এসব তথ্য জানা গেছে।

যে ১৮টি জেলায় টিসিবি’র কোনও পণ্য পৌঁছায়নি তার মূলে রয়েছে প্রশাসনের উদাসীনতা এবং পণ্য উত্তোলনে ডিলারদের অনীহা। এ জেলাগুলো হচ্ছে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, নরসিংদী, ভোলা, নোয়াখালী, ফেনী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগে মাত্র ১. ৩৯ শতাংশ ডিলার টিসিবি’র পণ্য উঠিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করেছেন। আর তুলনামূলক একটু বেশি কার্যক্রম ছিল বরিশাল বিভাগে। এই বিভাগের ৩৬.০৮ শতাংশ ডিলার টিসিবি’র পণ্য উত্তোলন করেছেন, যদিও বিভাগের অন্তর্গত ভোলা জেলায় এ কার্যক্রমে অংশ নেননি কোনও ডিলার, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলাতেও টিসিবি’র পণ্য তুলেছেন গুটি কয়েক ডিলার।

তবে এসব জেলার ডিলারদের দাবি, টিসিবি’র পণ্য আনতে হয় বিভাগীয় শহরের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে। এ বছর বরাদ্দ করা পণ্যের পরিমাণ কম হওয়ায় পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তাই তারা লোকসানের সম্ভাবনা থাকায় এবারে পণ্য ওঠাননি। এছাড়াও গত বছর পণ্যের মান খারাপ হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে জবাবদিহি করার বাজে অভিজ্ঞতার কারণে এবার টিসিবি’র পণ্যের ব্যাপারে তারা আগ্রহী ছিলেন না।

আবার, যে ৩০টি জেলায় পরিবেশকরা (ডিলার) টিসিবি’র পণ্য উত্তোলনের ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন তাদের অভিযোগ, বরাদ্দ বন্ধ করে কিংবা কমিয়ে দিয়ে টিসিবি তাদের পণ্য বিক্রির ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেছে। এভাবে ইচ্ছেকৃতভাবেই এ কর্মসূচিকে ব্যর্থ করেছে টিসিবি। তবে, টিসিবি’র আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো দাবি করেছে, ডিলারদের পণ্য সরবরাহের আগে বরাদ্দের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। তাই এক্ষেত্রে যখন যে নির্দেশনা এসেছে তারা তাই পালন করেছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রোজা শুরুর প্রথম চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই বেশিরভাগ জেলায় টিসিবির দোকান ও ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পণ্য বিক্রি একদম বন্ধ হয়ে গেছে। চট্টগ্রামে এই কর্মসূচি বন্ধ হয়েছে ১৬ জুন। রংপুরে বন্ধ হয়েছে ২১ জুন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৯ জুন পর্যন্ত টিসিবি’র কিছু কার্যক্রম চোখে পড়লেও পরে আর তা দেখা যায়নি। ডিলাররা অভিযোগ করেছেন, পণ্য বরাদ্দ না পেয়ে এ কর্মসূচি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন তারা। রাজশাহী বিভাগীয় শহর হওয়া সত্ত্বেও এখানে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করতেই দেখা যায়নি। এখন রাজধানীর কয়েকটি স্পট ছাড়া আর কোথাও টিসিবি’র খাদ্য পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। এছাড়াও শহরে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে করে পণ্য বিক্রির সুযোগ কোনও ডিলার এককভাবে পাননি। অল্প বরাদ্দের অজুহাত দেখিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জেলা শহরের ডিলারদের দেওয়া হয়েছে এভাবে পণ্য বিক্রির সুযোগ। এছাড়াও শুরুতে যে পরিমাণ পণ্য ডিলারদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরবর্তীতে পণ্য ওঠাতে এসে তারা পেয়েছেন এরচেয়েও কম পরিমাণের পণ্য। ফলে অনেক ডিলারই পণ্য ওঠানোর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অনেকেই তাদের পণ্য না দিয়ে কালোবাজারি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে টিসিবি’র রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তা মিশকাতুল আলম জানান, ঢাকার হেড অফিস থেকে প্রতিদিন যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হতো সেভাবেই তারা ডিলারদের কাছে পণ্য সরবরাহ করেছেন। ওপরের নির্দেশনাপত্র অনুযায়ীই একেকদিন ডিলারদের একেকরকম পণ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। কালোবাজারি হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কেউ প্রমাণ দিতে পারলে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও দাবি করেন, রংপুর বিভাগীয় শহরে প্রতিদিন ৫টি করে ট্রাকে ও অন্য ৭টি জেলায় প্রতিদিন দুটো করে ট্রাকে ভ্রাম্যমাণভাবে টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়েছে।

তবে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁওসহ কয়েকটি জেলা ঘুরে আমাদের প্রতিনিধিরা ভ্রাম্যমাণভাবে পণ্য বিক্রির কোনও কার্যক্রম দেখতে পাননি। স্থানীয়রাও তাদের জানিয়েছেন, সেখানে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি হয়নি।

তবে এ বছর টিসিবি’র নায্যমূল্যের পণ্য দেশের কোথাও বাড়তি দামে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

এদিকে, চলতি বছর পণ্যের মান ভালো হলেও পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং অতীতের বিরূপ অভিজ্ঞতার কারণে মাঠ পর্যায়ে টিসিবি’র লাইসেন্স ফিরিয়ে দিয়ে জামানতের টাকা ফেরত চান অনেক ডিলার। এজন্য অনেকে আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছেন। আবার লাভ কম হওয়া এবং টিসিবি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ওজনে কম দেওয়া এবং খারাপ পণ্য দেওয়ায় নিজেদের ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণে লাইসেন্স নবায়নও করেননি সিংহভাগ ডিলার।

প্রত্যেক ডিলারই জানিয়েছেন, টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করে এখন আর মুনাফা হয় না। তাই এসব পণ্য ওঠানোর ব্যাপারে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

চাঁদপুর সদর উপজেলার পুরাণবাজারের মেসার্স এসপি ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী লিটন বণিক বলেন, ‘আমরা ডিলারশিপ নবায়নই করিনি। কারণ, এগুলো করলে মানসম্মানই থাকে না। তিনি বলেন, নিম্নমানের পণ্য। তাছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণ পাওয়াও যায় না। উপরন্তু ঢাকা থেকে পণ্য আনতে গাড়ি ভাড়া দিয়ে ব্যবসা বলতে তেমন কিছুই থাকে না।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘দেখা গেল, আমরা পেয়েছি, ভেজা চিনি। পরে দেখা যাবে পত্রপত্রিকায় খবর এসেছে, অমুক ডিলার ভেজা-ময়লা চিনি বিক্রি করছে। এতে আমাদের বদনাম হয়। সঠিকভাবে ব্যবসা করে যখন চোর সাজতে হয়, এমন ব্যবসা না করাই ভালো।’

এদিকে, জেলা শহরগুলোতে টিসিবি’র ডিলারদের তালিকা খুঁজে পেতেও রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে পাওয়া গেছে, বেশিরভাগ জেলা প্রশাসনের কাছে জেলায় নিযুক্ত টিসিবি’র ডিলারদের তথ্যও নেই। এ কারণে বেশিরভাগ জেলায় টিসিবি’র কর্মসূচি প্রশাসনের নজরদারিতে ছিল না। টিসিবি’র আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রতিটি জেলার ডিলারদের তালিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও এদের মধ্যে কতোজন ডিলারকে তারা পণ্য সরবরাহ করেছেন সেই তথ্য এড়িয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। পরে তাদের তালিকা ধরেই নিবিড় অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বাংলা ট্রিবিউন প্রতিনিধিরা খুঁজে বের করেছেন এসব তথ্য।

পণ্য ডিলাররা জানিয়েছেন, তাদের টিসিবি’র আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো থেকে পণ্য সরবরাহ করা হয়। এসব কার্যালয় বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত হওয়ায় জেলা পর্যায়ে টিসিবি’র ডিলারদের পণ্য উত্তোলনের ব্যাপারে আগ্রহ কম। মূলত কম বরাদ্দ আর পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াই পণ্য না ওঠানোর প্রধান কারণ। সারাদেশের ডিলাররাই এ তথ্য দিয়েছেন।

পণ্য উঠিয়েছেন এমন ডিলারদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে সাধারণ মানুষের কাছে বিপুল চাহিদা থাকলেও চাহিদার অর্ধেক পণ্যও টিসিবি সরবরাহ করেনি। গতবার যে পণ্য দুই টন দেওয়া হয়েছিল এবার তা দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০০ কেজি। ফলে চাহিদামতো পণ্য না পাওয়ায় বিভাগীয় শহরে অবস্থিত টিসিবি’র আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পণ্য তুলে জেলা শহরে নিয়ে আসতে যে পরিবহন খরচ হয় তাতে টিসিবি’র নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করে পোষানো যায় না।

খুলনা অঞ্চলের ডিলাররা অভিযোগ করেছেন এবার তাদের ভোজ্য তেল ও খেজুর সরবরাহ করা হয়নি। খেজুর না পাওয়ার অভিযোগ আছে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেশিরভাগ ডিলারের অভিযোগ, গত বছর তাদের মানসম্মত পণ্য দেওয়া হয়নি। এমনকি কী ধরনের পণ্য দেওয়া হচ্ছে তাও ডিলারদের আগাম জানতে দেওয়া হয় না। এর ফলে ভেজা চিনিসহ কম ওজনের সয়াবিন তেল এবং নিম্নমানের ডাল নিয়ে তারা ক্রেতাদের রোষানলে পড়েছেন। এমনকি অনেকে সন্দেহপোষণ করেছেন, তারা ভালোমানের পণ্য কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়ে ইচ্ছে করেই খারাপ পণ্য এনে টিসিবি’র পণ্য হিসেবে বিক্রি করেছেন। এসব কারণে সম্মান ক্ষু্ণ্ন হওয়ায় এবারে টিসিবি’র পণ্য তোলার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি তারা।

মূলত ডিলারদের গত বছরের এই অভিজ্ঞতা এ বছর রমজানে টিসিবি’র ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে মারাত্মক অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়। এ বছর মোটামুটি ভালোমানের পণ্য দিয়েও ডিলারদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি টিসিবি কর্তৃপক্ষ। উল্টো প্রায় সব জেলাতেই অনেক ডিলার তাদের লাইসেন্স ফিরিয়ে নিয়ে জামানতের টাকা পরিশোধের জন্য টিসিবি’র কাছে আবেদন করেছেন বলেও মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। এছাড়াও যারা ডিলারশিপ ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেননি টিসিবি’র নির্দেশনা সত্ত্বেও এদের অনেকেই তাদের লাইসেন্স নবায়ন করেননি।

বাগেরহাট জেলায় টিসিবি’র ডিলার মোট ২৯ জন। এর মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করেছেন মাত্র ৯ জন। এই ৯ জনের মধ্যে ৬ জন প্রথম কিস্তির পণ্য ওঠালেও পরে আর আগ্রহ দেখাননি। তাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অল্প বরাদ্দের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং টিসিবি’র পণ্যের দাম বাজারের কাছাকাছি হওয়ায় এতে কোনও মুনাফা হচ্ছে না। তাই তারা আর এসব পণ্য ওঠানোর ব্যাপারে আর আগ্রহ দেখাননি।

এদিকে, সব জেলাতেই ডিলারদের অভিযোগ, ক্রেতাদের চাহিদার বিষয়ে টিসিবি মোটেও দৃষ্টি দেয় না। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হলেও পণ্য সরবরাহের ব্যাপারে মোটেও আন্তরিক নয়।

বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার প্রভাতী ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী শেখ মশিউর রহমান বলেন, এবারের পণ্যের মান ভাল ছিল। চাহিদা ছিল অনেক বেশি কিন্তু বরাদ্দ ছিল অতি সামান্য। বরাদ্দ পাওয়া পণ্য ২ দিনেই শেষ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, প্রতি মাসে যদি ২/৩ বার বরাদ্দ দেওয়া হয় তাহলে জনগণের উপকার হবে। বাজার দরও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানীসহ বিভাগীয় শহর ও বড় জেলাগুলোতে গণমাধ্যমের চোখে পড়ার জন্য দায়সারাভাবে ‘ট্রাক সেল’ এর মাধ্যমে রোজা শুরুর আগে থেকে প্রথম কয়েকদিন কিছু পণ্য বিক্রি করে টিসিবি। কিন্তু, জেলা শহরগুলোতে এর তেমন কোনও কার্যক্রম চোখে পড়েনি। কোনও কোনও জেলা সদরে কর্মসূচি শুরু করার চার-পাঁচদিনের মধ্যেই কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নড়াইলে টিসিবির ৩৭ জন ডিলার থাকলেও লাইসেন্স নবায়ন করেছেন মাত্র ৯জন ডিলার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দু’জন ডিলার এ প্রতিনিধিকে জানান,পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে টিসিবির গড়িমসির কারণে তারা প্রায়ই ঠিকমত মাল তুলতে পারেন না। রমজান মাসে তাদের কোন পণ্য সরবরাহ করা হয় নাই। একমাত্র খোকন নামে রূপগঞ্জ বাজারের একজন ডিলারকে রমজান শুরুর দিন ও পরেরদিন বরাদ্দ দিয়েই পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ বলেন, রমজান শুরুর প্রাক্কালে টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়েছিলো। এখন তা বন্ধ রয়েছে।

আবার, সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি নজরদারি করার জন্যও যেন কোনও সংস্থা নেই। ডিলারদের তথ্য এবং এ কার্যক্রমের ব্যাপারে বাংলা ট্রিবিউন-এর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেছেন, জেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্যই নেই। অনেক জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন টিসিবি’র অনুমোদিত ডিলার কারা এবং কিভাবে তারা কতোটুকু পণ্য কিনে বিক্রি করে থাকে তার কোনও তথ্য তাদের কাছে পৌঁছে না।

টিসিবির ঢাকা অফিস থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় চাঁদপুর ও কুমিল্লার কার্যক্রম। কুমিল্লা জেলা শহর ঘুরে এর কোনও কার্যক্রম দেখতে পাননি আমাদের প্রতিনিধি। জেলা প্রশাসনের নজরদারিও ছিল না বিষয়টির ওপর। তাই জেলা প্রশাসক মো.হাসানুজ্জামান কল্লোল ও এ বিষয়ে তেমন কিছু অবহিত নন বলে স্বীকার করেন। তিনি খোঁজ নিয়ে এ ব্যাপারে তথ্য দেওয়ার কথা বলেন।

কক্সবাজারে টিসিবি’র কার্যক্রম না থাকার কথা স্বীকার করেছেন জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা মো. শাহাজাহান।

এ কারণে কুষ্টিয়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিলার সরাসরি মন্তব্য করেছেন, টিসিবি একটি অক্ষম প্রতিষ্ঠান। এমন প্রতিষ্ঠানের হয়ে সেবা দিতে চাওয়া আর নিজেই নিজের নাক পোড়ানো একই কথা। এ প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রি করতে গেলে নিজের মান-সম্মান নিয়েই টানাটানি পড়ে যায়। এ কারণে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করে দেশসেবায় অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন ডিলাররা।

এমনকি প্রায় প্রতিটি জেলার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র নেতারা টিসিবিকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করার সুযোগ না থাকায় ডিলার ও ব্যবসায়ীরা এর ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। তাই টিসিবি’র পণ্য বাজারে কোনও প্রভাব ফেলতে পারে না। কিন্তু, বাজারকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে এই প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করার কোনও বিকল্প নেই।

এ প্রসঙ্গে ফেনী চেম্বার অব কমার্স এর সভাপতি আইনুল কবির শামীম বলেন, টিসিবি’র পণ্য নিম্নমানের হওয়ায় ফেনীর ডিলাররা পণ্য তুলতে রাজি নয়। ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করা হলে এবং একটু মুনাফার সুযোগ থাকলে ডিলাররা টিসিবি’র পণ্য তুলে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করতে আগ্রহী হবেন।

এছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিলারদের বিরুদ্ধে টিসিবি’র পণ্য কালোবাজারি করার যেমন অভিযোগ রয়েছে, তেমনি ডিলারদের অভিযোগ, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা যাচাই না করে কেবলমাত্র দলীয় ভিত্তিতে টিসিবি’র ডিলারশিপ দেওয়ায় এই তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে অসংখ্য ভুইফোঁড় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে। এলাকায় যাদের প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড পর্যন্ত নেই। এরাই পণ্য তুললে কালোবাজারি করেন আবার পণ্য না তুলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলেন।

যেমন, ফেনী শহরে সরেজমিনে ঘুরে অধিকাংশ ডিলারের প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ডের অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি ।

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment