পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যানকে গলা কেটে হত্যা

CNS

ক্রাইম নিউজ সার্ভিসঃ রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় মুরিদ সেজে খানকাহ শরীফে ঢুকে এক পীরকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। তার নাম ইঞ্জিনিয়ার মুহম্মদ খিজির খান (৬৫)। পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে।

নিহত খিজির খান পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, ধর্মীয় মতাদর্শের বিরোধের জের ধরে উগ্রপন্থী কোনও দল তাকে হত্যা করে থাকতে পারে। পুলিশ জানায়, মধ্যবাড্ডার জ-১০/১ নম্বর গুদারাঘাট এলাকার ছয় তলা বাসার তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন খিজির খান। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় রহমতীয় খানকাহ শরীফ ছিল তার। তিনি ওই খানকাহ শরীফের পীর ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ৭-৮ জন যুবক ওই বাসার তৃতীয় তলায় গিয়ে খিজির খানের খোঁজ করেন। এসময় তারা নিজেকে খানকাহ শরীফের পীরের মুরিদ হিসেবে পরিচয় দেন। বাসার লোকজন তাদের দ্বিতীয় তলায় যেতে বলে। কিন্তু তারা হঠাৎ পরিবারের লোকজনকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করেন। দুর্বৃত্তরা এসময় নিহত খিজির খানের স্ত্রী, পূত্রবধূ, নাতি ও তিন গৃহকর্মীর হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলে। পরে দুর্বৃত্তদের একটি দল দোতলায় গিয়ে কথিত পীর খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা করে। দুর্বৃত্তরা চলে গেলে পরিবারের লোকজন চিৎকার করলে আশেপাশের লোকজন ছুটে যায়।

খবর পেয়ে পুলিশ খানকাহ শরীফের বাথরুমের সামনে থেকে খিজির খানের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এদিকে খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ডিবি, র‌্যাব, সিআইডি, পিবিআইয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। সিআইডির ক্রাইম সিনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ন কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, পুলিশ হত্যাকা-ের কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করছে। দুর্বৃত্তরা মুরিদ সেজে খানকাহ শরীফে প্রবেশ করেছিল। পরে তারা খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

স্থানীয় ফেরদৌস নামে এক ব্যক্তি জানান, নিহত খিজির খানের বাবা মৌলভি রহমত উল্লাহ পীর ছিলেন। বাবার সূত্রে তিনি নিজেও পীর হিসেবে খানকাহ শরীফের দায়িত্ব পালন করতেন। খিজির খান সবসময় গাড়িতে যাতায়াত করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার ওই খানকাহ শরীফে দরবার বসতো। দরবারে বিভিন্ন মুরীদরা অংশ নিত ও জিকিরের আয়োজন করা হতো।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহত খিজির খান ২০০৭ সালে পিডিবির চেয়ারম্যান হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায় দৌলতপুরের ফিলিপনগরে বলে জানা গেছে।

নিহত খিজির খানের আত্মীয় তৌহিদুল ইসলাম ও মুরীদ নুর-উস-সালাম জানান, বাবার মৃত্যুর আগে থেকেই খিজির খান খানকাহ শরীফের ইমামতি করতেন। বাবার মৃত্যুও পর তিনি খানকাহ শরীফের পীরের আসনে বসেন। প্রতি বৃহস্পতিবার দরবার ছাড়াও প্রতি আরবী মাসের ১১ তারিখে এই খানকাহ শরীফে মাহফিলের আয়োজন হতো। সেখানে তিনি কোরআন হাদীসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। হত্যার আগে তিনি তিনি এশার নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এজন্য খানকাহ শরীফের ওজু খানায় গিয়েছিলেন। ওজু খানার সমানেই তাকে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

স্বজনেরা জানান, নিহত খিজির খান দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক ছিলেন। স্ত্রীর নাম ফিরোজা বেগম। তার বড় ছেলে মতিউর রহমান পিডিবিতে কর্মরত। বর্তমানে তিনি চীনে অবস্থান করছেন। মেজ মেয়ে রাবেয়ার বিয়ে হওয়ায় সে শশুর বাড়িতে থাকে। আর সেজ ছেলে আহমেদুল্লাহ বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নী চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে রাফেলা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত।

নিহত খিজির খানের শ্যালক আমানুর রহমান জানান, সপ্তাহখানেক আগে কয়েকজন লোক এসে বাসা ভাড়ার জন্য ৬ হাজার টাকা অগ্রীম দিয়ে যায়। তারাই সোমবার ওই বাসায় গিয়ে তার বোন জামাইকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করছেন তিনি। নিহত খিজির খানের গাড়িচালক মোস্তফা জানান, ৮-১০ জন দুর্বৃত্ত বাসায় এসেছিল। তারা হুজুরের সঙ্গে কথা বলবে বললে তাদের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে হুজুরের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। এক পর্যায়ে হুজুরের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে তার হাত-পা বেঁধে শুইয়ে ফেলে। এসময় আমেনা নামে এক গৃহকর্মী খানকাহ শরীফের ওজুখানা পরিষ্কার করছিল। সে হঠাৎ হুজুরকে বেধে শুইয়ে রাখতে দেখে চিৎকার করে। এসময় তৃতীয় তলা থেকে খিজির খানের স্ত্রী ও নাতি নিচে আসে। দুর্বৃত্তরা গৃহকর্মী আমেনাসহ তার স্ত্রী ও নাতিকে খানকাহ শরীফেই হাত-পা ও মুখ বেধে রাখে। পরে হাত-পা বাঁধা খিজির খানকে ওজু খানার কাছে নিয়ে পশু জবাইয়ের মতো ‘আল্লাহ আকবার’ বলে গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই করে। এরপর দুর্বৃত্তরা সেখানে হাত-পা ধুইয়ে পরিষ্কার হয়ে খানকাহ থেকে বেড়িয়ে যায়।

ভাগনে রোকনুজ্জামান জানান, খিজির খান সরকারের অনেক উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। বর্তমানে কুষ্টিয়ায় ১০৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলছে। এছাড়া কয়েক দিন ইঞ্জিনিয়ারদের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসব কারণেও তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

এদিকে গতকাল কথিত এই পীর খুন হওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা খানকাহ শরীফটি ঘিরে রাখে। ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া ওই বাসায় কাউকে প্রবেশ বা বাহির হতে দেয়নি। ঘটনার পর থেকেই ওই খানকাহ শরীফের সামনে শত শত লোক ভিড় করে। রাতে আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক মাহাবুবুল হক হানিফসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

পুলিশের গুলশান জোনের ডিসি মোস্তাক আহমেদ বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তাকে ধর্মীয় উগ্রপন্থী কোনও দল মতাদর্শের কারণে নাকি অন্য কোনও কারণে হত্যা করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই সংক্রান্ত আরো নিউজ

Leave a Comment