কল ড্রপ প্রতারণাঃ গ্রামীণফোনের অতিরিক্ত আয় কমপক্ষে শত কোটি টাকা

ক্রাইম নিউজ সার্ভিসঃ নেটওয়ার্কের কারণে ভয়েস কল ড্রপ হলে এক মিনিট ক্ষতিপূরণের ঘোষণা ফলাও করে প্রচার করলেও ‘গ্রাহকদের না জানিয়েই’ তা বন্ধ করে দিয়েছে বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন।

পাঁচ কোটির বেশি গ্রাহকের অপারেটর গ্রামীণফোনের এই আচরণকে ভোক্তা অধিকার কর্মীরা ‘প্রতারণা’ হিসেবে দেখছেন।

ক্ষতিপূরণ বন্ধের বিষয়টি গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল বলে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও কবে কীভাবে তা করা হয়েছিল, সে তথ্য তারা দিতে পারেনি।

কল ড্রপের জন্য কী পরিমাণ টকটাইম ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, সে তথ্যও দেননি গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস সৈয়দ তালাত কামাল।

টেলিকম শিল্প সংশ্লিষ্টদের আনুমানিক হিসাবে, কল ড্রপের কারণে গ্রাহকের নতুন করে কল করতে হওয়ায় তার মাধ্যমে গ্রামীণফোনের মতো বড় অপারেটর শত শত কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করছে।

বাংলাদেশে ছয়টি মোবাইল ফোন অপারেটরদের মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহকদেরই বেশি অর্থ গুণতে হয়। কয়েক কোটি প্রি-প্রেইড গ্রাহককে ১০ সেকেন্ড পালসের বিল পদ্ধতিতে আটকে রেখেছে কোম্পানিটি, বিপরীতে পোস্ট- পেইডের ক্ষেত্রে এক সেকেন্ড পালস।

গ্রামীণফোনের প্রি-পেইড ও পোস্ট-পেইড গ্রাহকদের কোনো হিসাব কোম্পানির কর্মকর্তারা দিতে না চাইলেও এই শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পোস্ট-পেইড গ্রাহকের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি নয়; যার অর্থ দাঁড়ায় গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের ৯৫ শতাংশ প্রি-পেইড গ্রাহক।

গ্রামীণফোনের একজন পোস্টপেইড গ্রাহককে প্রতিটি কলে প্রতি মিনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা (তার সঙ্গে ভ্যাট রয়েছে) করে খরচ করতে হয়, যা অন্য অপারেটরগুলোর তুলনায় বেশি।

গ্রাহক সংখ্যা পাঁচ কোটিতে পৌঁছানোর মাইলফলক উদযাপন করার সময় গত অক্টোবরে এই বিশেষ ‘অফার’ চালুর ঘোষণা দেয় গ্রামীণফোন। তার একদিন আগেই ‘মিনিট ব্যাক অন কল ড্রপ’ নামে একই ধরনের সেবা চালু করে প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটি অপারেটর।

গ্রামীণফোনের সিএমও অ্যালান বঙ্কে সে সময় বলেছিলেন, “আমাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের ওপর সবাই যেন আস্থা রাখতে পারেন, সেজন্য আমাদের নেটওয়ার্কের আওতায় যেসব গ্রাহক ফোন কল ড্রপের সম্মুখীন হচ্ছেন, তাদের সেই ড্রপ হওয়া কলের জন্য ৬০ সেকেন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।”

গ্রামীণফোনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ‘অফার’ গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কের আওতায় সব কলের জন্য প্রযোজ্য। একজন গ্রাহক একদিনে সর্বোচ্চ ৩০০ সেকেন্ড বা পাঁচ মিনিট এই সুবিধা পাবেন। এজন্য কোনো নিবন্ধনের প্রয়োজন হবে না।

ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলে গ্রামীণফোন একটি এসএমএস-এর মাধ্যমে তা গ্রাহককে জানাবে এবং পোস্টপেইড গ্রাহকরা মাসিক বিলের সঙ্গে ক্ষতিপূরণ পাবেন বলেও সে সময় জানানো হয়।

গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘোষণা আসার পর ‘দুই-একবার’ ক্ষতিপূরণ পেলেও ওই সুবিধা বাতিল করার কোনো তথ্য গ্রামীণফোন তাদের জানায়নি। এ বিষয়ে তারা কোনো এসএমএস পাননি, পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেখেননি।

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও গ্রামীণফোনের কলড্রপ সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, “গ্রাহক সংখ্যা বাড়লেও নেটওয়ার্কে যে পরিমাণ জোর দেওয়া প্রয়োজন তা তারা দেয়নি। ফলে কল ড্রপে ভোগান্তি বাড়ছেই।”

কল ড্রপের সমস্যাটি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। সেখানে ভোক্তা সংগঠনগুলো এ নিয়ে সরকারের পদক্ষেপহীনতাকে দায়ী করে আসছে।

তারা বলছে, ক্রমবর্ধমান গ্রাহকের কারণে নেটওয়ার্কের উপর চাপ বেড়ে যাওয়া যেমন কল ড্রপের কারণ, তেমনি এর পেছনে আয় বাড়াতে অপারেটরদের চাতুরিও রয়েছে।

১৫ বছরের বেশি সময় ধরে গ্রামীণফোন ব্যবহার করে আসা এক গ্রাহক বলেন, “গত জুন মাস থেকে কলড্রপের মাত্রা ভয়াবহ রকম বেড়ে গেছে। অনেক সময় কল রিসিভ করার পরপরই কেটে যাচ্ছে। এমনও হয়েছে যে তিন মিনিট কথা বলতে চারবার কল কেটে গেছে।”

গ্রামীণফোন ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়ার পর মাত্র দুই বার দুই মিনিট ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

ঢাকার কুনিপাড়া এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানা অভিযোগ করেন, গত একবছরে অন্তত একশবার কল ড্রপ হলেও তিনি এক মিনিটের ক্ষতিপূরণও পাননি।

গত জুন মাসে গ্রামীণফোনের পোস্টপেইড ইন্টারনেট গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েন। গ্রামীণফোন সে সময় বলেছিল, ‘সিস্টেম আপগ্রেড’ করার সময় ওই সমস্যা হয়েছিল।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিতে গ্রামীণফোনের বিষয়ে এ ধরনের অভিযোগ প্রায়ই আসছে বলে জানান এক কর্মকর্তা।

বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গ্রামীণফোন কলড্রপে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিটিআরসিকে জানিয়েছিল। তবে তা কবে বন্ধ করেছে বা গ্রাহকদের কীভাবে জানানো হয়েছে- তার কোনো তথ্য নেই।”

বিটিআরসির নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহককে কোনো ‘অফার’ দেওয়ার ক্ষেত্রে বা তা বন্ধ করার সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও গ্রাহককে জানাতে হয়।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গ্রামীণফোনের তালাত কামাল বলেন, “ক্ষতিপূরণ সুবিধা বাতিলের বিষয়ে আমরা গ্রাহকদের জানিয়েছি।”

তবে কবে কখন এই সুবিধা বাতিল করা হয়েছে বা গ্রাহকদের কীভাবে জানানো হয়েছে- সে বিষয়ে কোনো উত্তর তিনি দিতে পারেননি।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশেন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির ভূইয়া বলেন, “গ্রামীণফোন গ্রাহকদের ভালো নেটওয়ার্কের আশ্বাস দিয়ে ভোগান্তিতে ফেলেছে। এটা এক কথায় প্রতারণা।”

নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর পরিবর্তনের সুযোগ গ্রাহকদের এখনও দেয়নি গ্রামীণফোন। এক্ষেত্রে নিজেদের সময়সীমাও রাখতে পারেনি তারা। গ্রাহক ধরে রাখতেই গ্রামীণফোন তা করছে না বলে ভোক্তাদের অভিযোগ।

বিটিআরসির বিদায়ী চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। ভাইস চেয়ারম্যান আহসান হাবীব খান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

১৯৯৭ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে গ্রামীণফোন দেশের সর্ববৃহৎ মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং দেশের ৯৯ শতাংশ জনপদ তারা নিজেদের সেবার আওতায় এনেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির  দাবি।

বিটিআরসির জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১২ কোটি ৮৭ লাখ মোবাইল ফোন গ্রাহকের মধ্যে ৫ কোটি ৩৯ লাখ গ্রাহক গ্রামীণফোনের সেবা নিচ্ছেন। মুনাফাও তারা করছে বেশি।

মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে গ্রামীণফোনই শুধু পুঁজিবাজারে রয়েছে। তাদের ১০ শতাংশ শেয়ারই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় লগ্নি।

এ কোম্পানির ৫৫.৮ শতাংশ মালিকানা রয়েছে নরওয়ের কোম্পানি টেলিনরের হাতে। টেলিনরের আরও কয়েকটি দেশে ব্যবসা থাকলেও বাংলাদেশে গ্রামীণফোনের মাধ্যমে তাদের আয় ভারতীয় ইউনিনরসহ অন্যদের তুলনায় বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *