‘রিভিউয়ে’ শিশু ধর্ষক ফাঁসির আসামির সাজা কমল !

ক্রাইম নিউজ সার্ভিসঃ সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ১৪ বছর ধরে কারাগারে থাকা ফাঁসির আসামি শুক্কুর আলীর রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনে দণ্ড কমিয়ে দিয়েছে আপিল বিভাগ। মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার শিবরামপুর গ্রামের তরুণ শুক্কুর আলীকে এখন মৃত্যু পর্যন্ত কারাগারে কাটাতে হবে।

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ সোমবার রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন নিষ্পত্তি করে এই আদেশ দেন।

এই শুক্কুরের করা একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করেই গত ৫ মে আপিল বিভাগ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের তিনটি এবং ফৌজদারী দণ্ডবিধির একটি ধারা ‘সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ বলে রায় দেয়।

শুক্কুরের আইনজীবী এম কে রহমান আদেশের পর বলেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার পর দণ্ড কমানোর ঘটনা ‘তার জানা মতে’ এই প্রথম।

শুক্কুর এখন রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা (মার্সি) চাইবেন জানিয়ে তার আরেক আইনজীবী নাজনীন নাহার  দীপু বলেন, “আশা করি সেখানে প্রতিকার পাব।”

আদেশের সময় রাষ্ট্রপক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

১৯৯৬ সালের ১১ জুন মানিকগঞ্জের শিবরামপুর গ্রামে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে ১৯৯৯ সালে ১৪ বছর বয়সী কিশোর শুক্কুর আলীর বিচার শুরু হয়। ২০০১ সালের ১২ জুলাই মানিকগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল শুক্কুরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

শুক্কুর আলীর পক্ষে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) হাই কোর্টে গেলে ২০০৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সেখানেও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। পরের বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগেও শুক্কুরের সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকে। শুক্কুর আলী রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে ওই বছরের ৪ মে তাও খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ।

এদিকে বিচারিক আদালতের রায়ের এক বছর আগে ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়ন করে সরকার।

নতুন আইনে ধর্ষণ করে হত্যার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। অথচ আগের আইনে ধর্ষণ করে হত্যার দায়ে কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল, যা প্রযোজ্য হয়েছিল শুক্কুরের ক্ষেত্রে।

এ বিষয়টি তুলে ধরে শুক্কুর আলী ও ব্লাস্ট ২০০৫ সালের নভেম্বরে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন। ২০১০ সালের ২ মার্চ হাই কোর্ট ওই ধারা সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে। তবে আপিল বিভাগে শুক্কুর আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় হাই কোর্ট তাতে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ২৮ এপ্রিল আবারও আপিল বিভাগে আসেন শুক্কুর ও ব্লাস্ট। এছাড়া ওই আইনে সাজাপ্রাপ্ত আরও ১১টি আবেদন শুনানির জন্য আসে।

শুনানি শেষে গত ৫ মে আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড ছাড়া বিকল্প শাস্তির বিধান না রেখে প্রণীত ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন সংশোধনের পর আগের মামলাগুলো পুরনো আইনে চালানোর বৈধতা দিয়ে ২০০০ সালের আইনে যুক্ত একটি ধারা (৩৪ এর ২) সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

একইসঙ্গে ধর্ষণের শাস্তি সংক্রান্ত ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (বিশেষ বিধান) আইনের ৬ (২), ( ৩) ও (৪) এবং ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০৩ ধারাও শাসনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু শুক্কুরের দণ্ড বহাল থাকায় তিনি আপিল বিভাগে এই রায় পর্যালোচনার আবেদন করেন। তার নিষ্পত্তি করে সর্বোচ্চ আদালত সোমবার সাজা কমানোর আদেশ দিল।

আইনজীবী এম কে রহমান বলেন, মামলা হওয়ার সময় শুক্কুরের বয়স ছিল ১৪ বছর। বিচারিক আদালতে মামলা পরিচালনায় আসামিপক্ষের আইনজীবীরও অবহেলা ছিল, যা হাই কোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।

“২০০১ সালের ১২ জুলাই থেকে সে মৃত্যুর প্রহর গুণছে। আমরা এ বিষয়গুলো রিভিউ আবেদনে বলেছি। তাছাড়া আপিল বিভাগ সংশ্লিষ্ট আইনের কয়েকটি ধারা বাতিল করেছে, আমরা সেটিও বলেছি। এসব বিবেচনায় নিয়েই হয়তো আপিল বিভাগ সাজা কমিয়েছে।”

Please follow and like us:
0

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

SuperWebTricks Loading...