জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে জঙ্গি সদস্যরা

ক্রাইম নিউজ সার্ভিসঃ জামিনে বেরিয়েই আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। আত্মগোপনে থেকেই তারা পুনরায় সংগঠিত করার চেষ্টা করছে নিজ নিজ জঙ্গি সংগঠনগুলোকে। সমপ্রতি ত্রিশালে তিন জঙ্গি ছিনতাইয়ের অপারেশনে অংশ নেয়া জঙ্গি সদস্যদের অধিকাংশই বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিল। জামিনে বেরিয়ে তারা প্রথমে আত্মগোপনে চলে যায়। পরে গোপনে নিজেরা সংগঠিত হয়। যোগাযোগ করে কারাগারের অভ্যন্তরে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে। পরে পরিকল্পনা করে ছিনিয়ে নেয় তিন শীর্ষ জামা’আতুল মুজাহিদীন অব বাংলাদেশ- জেএমবি নেতা সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন, রাকিব হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ ও জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজানকে। একের পর এক জঙ্গি সদস্যরা জামিনে বেরিয়ে এলেও কোন হদিস পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এক্ষেত্রে নজরদারির যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে তিন জঙ্গি ছিনতাইয়ের আগে মাস জুড়ে কাশিমপুরের কারা অভ্যন্তরে থেকে বাইরের জঙ্গিদের সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়টি নিয়ে ফেঁসে যাচ্ছেন কয়েকজন কারা কর্মকর্তা। প্রথম দিকে কারাগারে জ্যামার লাগানোর কারণে কথা বলার সুযোগ নেই এই দাবি করলেও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হাতে কল রেকর্ডস আসার পর তারা এ নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হচ্ছে না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন কারণে জঙ্গি সদস্যরা জামিনে বেরিয়ে আসছে। জামিনে বেরিয়ে আসার পর আদালতে পরবর্তীতে হাজিরার তারিখে তারা আর হাজির হচ্ছে না। পুরোপুরি আত্মগোপনে চলে যায় তারা। আত্মগোপনে থেকেই নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে।

সূত্র জানায়, ত্রিশালের জঙ্গি ছিনতাইয়ের নেতৃত্বদানকারী ফারুক হোসেন ওরফে আনোয়ার হোসেন জেএমবি’র তৃতীয় সারির নেতা। ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিল। কিন্তু বিচার শেষ না হওয়ায় ২০১২ সালে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে। এরপর থেকে সে আত্মগোপনে ছিল। এমনকি তার জামালপুরের মেলান্দহের বাড়িতেও কখনও যায়নি। কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেই সে নিজেকে স্বঘোষিত জেএমবি’র আমীর দাবি করে। ফারুকের এই দলে অন্তত ৩০ জন ‘ডেডিকেটেড’ সদস্য রয়েছে। যাদের প্রায়  প্রত্যেকেই বিভিন্ন সময়ে জেল খেটেছে। জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে তারা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

জঙ্গি নিয়ে কাজ করেন এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, সব সময় জঙ্গিদের শীর্ষ নেতাদের ওপর নজরদারি করা হয়। কিন্তু তৃতীয় সারি বা আরও সাধারণ পর্যায়ের জঙ্গি সদস্যদের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা বা কর্মকাণ্ড সেভাবে নজরদারি করার সুযোগ নেই। ফলে তৃতীয় সারির এসব নেতাই নিজেরা সংগঠিত হয়ে ত্রিশালের এই অপারেশন চালিয়েছে।

সূত্র জানায়, ত্রিশালের অপারেশনের পর গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি সদস্য জাকারিয়া জানায়, সে ২০০৫ সালে সবুজবাগে অস্ত্রসহ ধরা পড়েছিল। প্রায় সাত বছর জেল খেটে সেও ২০১২ সালে জামিনে বেরিয়ে আসে। তাদের জেল থেকে বেরিয়ে আসার নেপথ্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছে বলেও সে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।

জাকারিয়া জানিয়েছে, বাইরে থাকা তাদের সহযোগীরা তাদের জামিনে বের করে আনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে। নিম্ন আদালতে  জামিন না হলে অনেক সময় তারা উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে বেরিয়ে আসে। একবার কারাগার থেকে বেরিয়ে এলে তারা আর আদালতে হাজিরা দিতে যায় না।

জাকারিয়া ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা মূলত স্বঘোষিত আমীর ফারুকের নির্দেশে জঙ্গিদের জামিনে বের করে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে থাকে। এ ছাড়া কারাগারে আটক জঙ্গিদের পরিবারের ভরণ-পোষণেও সহায়তা করে থাকে। তাদের সাংগঠনিক কাজে অর্থ লেনদেনের জন্য ডাচবাংলা ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় একটি হিসাবও খোলা রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিরা জামিনে বেরিয়েই পালিয়ে যায়। আত্মগোপনে থেকে তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ থাকায় তারা কখনোই পুরোপুরি সংগঠিত হতে পারছে না।

এদিকে র‌্যাবের গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, আদালত থেকে জামিনে অনেক জঙ্গি বেরিয়ে গেছে। কারাগার থেকে বেরিয়ে তারা আর আগের ঠিকানায় অবস্থান করে না। এজন্য তাদের নজরদারি করাটা একটু কঠিন হয়ে যায়। তারপরও জামিন পাওয়া জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সবসময় খোঁজ-খবর রাখা হয়।

সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে ১৯২ জন জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে। এদের মধ্যে অন্তত ৯১ জনের কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, পলাতক এই জঙ্গিরাই নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার  পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জানান, পলাতক জঙ্গিদের ধরতে সবসময় গোয়েন্দা নজরদারি চলে।

ত্রিশালে কমান্ডো স্টাইলে অপারেশন চালিয়ে তিন জঙ্গিকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় কয়েকজন কারা কর্মকর্তা ফেঁসে যেতে পারেন। জ্যামার বন্ধ করে রাখা ও দুর্ধর্ষ তিন জঙ্গিকে মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। কারা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম দিকে কারা কর্মকর্তারা কারাগারের ভেতর থেকে মোবাইলফোনে কথোপকথনের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে। এ সময় কারা কর্তৃপক্ষ প্রিজন ভ্যানে পুলিশের মোবাইল ফোন দিয়ে জঙ্গিরা কথা বলেছে বলে জানায়। তবে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা কল রেকর্ডস ঘেটে জানতে পারে প্রায় এক মাস ধরে কারাগারের ভেতর থেকেই তিন জঙ্গি বাইরে কথাবার্তা ও মেসেজ আদান প্রদান করেছে।

গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন রাতে জঙ্গি সদস্যরা মোবাইল ফোন থেকে কথা বলতো। এ ছাড়া সাংকেতিক ভাষায় মেসেজ আদান-প্রদান করতো। তাদের এই কাজে কারাসংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তা সহায়তা করেছে। তাদের চিহ্নিত করার কাজও চলছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করা হলেও কারা-সংশ্লিষ্ট কোন কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *