৯ বছরের গৃহকর্মী জান্নাত কে ধর্ষণ ও শ্বাস রোধ করে হত্যা

ক্রাইম নিউজ সার্ভিসঃ জান্নাতের বয়স মাত্র ৯ বছর। ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে বাবা হাবিবুর রহমান মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে। আড়াই বছর বয়সী এক ছোট বোন আছে। পরিবারে উপার্জনক্ষম কোন লোক নেই। খেয়ে-পরে বাঁচার তাগিদে মা সুমি বেগম গৃহস্থালির কাজে দিয়েছেন জান্নাতকে। গৃহকর্মী জান্নাত ও গৃহকর্তা খাদেমুল বাশারের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়। এ কারণে মেয়েকে কাজে দিয়ে মা সুমি বেগম ছিলেন অনেকটা নির্ভার। কাজে নেয়ার আগে খাদেমুল অনেক আশ্বাস দিয়েছিল জান্নাতের মাকে। বলেছিল- নিজের মেয়ের মতো আদর যত্ন করেই রাখবে জান্নাতকে। প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ের ব্যবস্থাও করবে। খাদেমুলের এ আশ্বাসে নিষ্পাপ শিশুটিকে কুমিল্লা থেকে রাজধানীর উত্তরায় পাঠিয়েছেন হতভাগা মা সুমি বেগম। সুমি কখনও ভাবতে পারেননি ঢাকায় আসার ১০ মাসের মাথায় খুন হতে হবে জান্নাতকে। বিলাপই হবে তার একমাত্র সঙ্গী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল খুন নয়। শ্বাস রোধ করে হত্যার আগে কোমলমতি শিশুটির ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। এরপর আত্মহত্যার নাটক সাজাতে লাশ কিছুক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা হয় শয়ন কক্ষের জানালার গ্রিলের সঙ্গে। এরপর নেয়া হয় উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে। হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হন- এটা আত্মহত্যা নয়। পরিষ্কার হত্যাকাণ্ড। হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। ডাক্তারদের কাছ থেকে এ তথ্য জানার পর গৃহকর্তা ও তার স্বজনরা লাশ হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝতে পেরে তাদের আটক রেখে পুলিশে খবর দেয়। বুধবার উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় ঘটে পাশবিক ঘটনা।

এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে গতকাল ৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার আসামিরা হলো- গৃহকর্তা খাদেমুল বাশার (৩৪), খাদেমুলের স্ত্রী সানজিদা (২৫), শ্যালক জুবায়েদ হোসেন (১৮) এবং বন্ধু কামরুল ইসলাম (৩৩) ও রফিকুল ইসলাম (৩৪)। জড়িত থাকার সন্দেহে খাদেমুল বাশার, জুবায়েদ হোসেন, কামরুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার অপর আসামি সানজিদাকে এখনও গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে গতকাল আদালতে পাঠানো হয়। আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

জান্নাতের লাশ গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মা সুমি বেগম ও অন্য স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে মর্গের পরিবেশ। বিলাপ করতে করতে সুমি বলেন, আদরের মেয়েটি ২ মাস আগে গ্রামে গিয়েছিল। বলেছিল, আমি আর ওই বাসায় কাজ করবো না। তোমার সঙ্গে গ্রামে থাকবো। আমি অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বলেছি- আর কয়েকটা মাস কাজ করো। পরে তোমাকে গ্রামে নিয়ে আসবো। তুমি আমার সঙ্গেই থাকবা। আমি যদি তখন মেয়েকে ঢাকায় না পাঠাতাম, মেয়ের আবদার রাখতে পারতাম, তাহলে আজ আমাকে তার লাশ বইতে হতো না।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি খন্দকার রেজাউল হাসান জানান, বুধবার রাতে স্থানীয় ক্রিসেন্ট হাসপাতালে গৃহকর্মী জান্নাতকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যান খাদেমুলের স্ত্রী সানজিদা আক্তার। পরে হাসপাতালে আসে খাদেমুল বাশার, কামরুল ইসলাম এবং রফিকুল ইসলাম। ক্রিসেন্ট হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ওই গৃহকর্মীকে মৃত বলে ঘোষণা করলে তারা হাসপাতাল থেকে পালানোর চেষ্টা করে। খবর পেয়ে রাত ৯টার দিকে উত্তরার পশ্চিম থানার এসআই নজরুল ইসলাম হাসপাতালে গিয়ে গৃহকর্মীর মৃতদেহ উদ্ধার করেন। ওই সময় খাদেমুল ও তার স্বজনরা পুলিশকে জানায়, গৃহকর্মী জান্নাত আত্মহত্যা করেছে। সন্দেহ ঘনীভূত হলে পুলিশ তাদের নিয়ে উত্তরার ওই বাসায় যায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বাসায় অবস্থানরত সানজিদার ভাই জুবায়েদ হোসেন (১৮) পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

গ্রেপ্তারকৃতরা বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানে না উল্লেখ করে জানিয়েছে, ঘটনার সময় তারা কেউ বাসায় ছিল না। ওই সময় জান্নাত একা বাসায় ছিল। তবে বাড়ির দারোয়ান আমাদেরকে জানিয়েছেন- ঘটনার সময় খাদেমুলসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা বাসাতেই ছিল।

একই ধরনের তথ্য জানিয়েছে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি (তদন্ত) আলী মাহমুদ। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা একেক বার একেক ধরনের কথাবার্তা বলছে। এক জনের কথার সঙ্গে আরেক জনের কথার গরমিল পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের ধারণা- খাদেমুলের শ্যালক জুবায়েদ হোসেন ঘটনাটি ঘটিয়েছে। বিষয়টি পরিবারের অন্য সদস্যরাও জানে। রিমান্ডে আসামিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে।

মামলার বাদী এসআই নজরুল ইসলাম সুরতহাল রিপোর্টের বরাত দিয়ে বলেন, মেয়েটির শরীরে এমন কিছু ক্ষত রয়েছে তাতে মনে হচ্ছে সে ধর্ষিত হয়েছে। তিনি জানান, গৃহকর্তা খাদেমুল একজন ব্যবসায়ী। সে কেমোথেরাপির মালামাল সরবরাহ করে।
নিহত জান্নাতের বাড়ি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া থানার বড়দেশিয়া গ্রামে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *